শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

বিজ্ঞান ও সমকালীন ইসলামি চিন-া



২০১২-০২-২০

বৈজ্ঞানিকদের চিন-ার মূলে একটা বিশেষ বিশ্বাস কাজ করে। এই বিশ্বাসকে বলে প্রাকৃতিক নিয়মের একানুবর্তিতা (Principle of Uniformity of Nature)। এই বিশ্বাস ছাড়া বিজ্ঞান দাঁড়াতে পারে না। এক বায়ুচাপমাত্রার পানিকে ফুটাতে হলে সর্বত্রই লাগবে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। না হলে পানি ফুটবে না। এ হলো প্রাকৃতিক নিয়মের একানুবর্তিতার একটা সাধারণ দৃষ্টান-। এই বিশ্বাসকে বাদ দিয়ে জ্ঞৈানিকদের চিন-াভাবনা অগ্রসর হতে পারে না। আমি মঙ্গলগ্রহ থেকে আসা প্রস-রখণ্ড নামক প্রবন্ধে (২৩ জানুয়ারি ২০১২) বলেছিলাম, কতগুলো অনুকূল প্রাকৃতিক অবস'ার সমাবেশে প্রাণের আবির্ভাব সম্ভব। এটা আমার কোনো নিজের কথা নয়। এটা হলো বৈজ্ঞানিকদের সাধারণ বিশ্বাসের ব্যাপার। মো: বেলাল খান এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন- আমার বক্তব্য ইসলামি ধর্মচিন্তার পরিপন'ী। কিন' তা হলো বৈজ্ঞানিক চিন-ার সাধারণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমি কারো ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করার কথা আদৌ ভাবিনি। বৈজ্ঞানিক চিন-ার একটা ছক গড়ে উঠেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বিখ্যাত ফরাসি বৈজ্ঞানিক লাভোয়াজিয়ে বলেন- যাকে বলা হয় জীবন, তা আসলে হলো কতগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমষ্টিমাত্র। তার বক্তব্যকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের জগতে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা পেতে পেরেছে যে, জীবনের বাস্তবতার মূলে যেসব রাসায়নিক বিক্রিয়া আছে, যেখানেই তারা ঘটতে পারবে সেখানেই উদ্ভব হবে প্রাণবান বস'। বৈজ্ঞানিকেরা মনে করেছেন, বহু বছর আগে মঙ্গলগ্রহের অবস'া ছিল পৃথিবীর অনুরূপ। সেখানে তাই ঘটতে পেরেছে পৃথিবীর অনুরূপ রাসায়নিক বিক্রিয়া। আর তার ফলে সেখানে উদ্ভূত হতে পেরেছে সজীব বস'। মো: বেলাল খানের মতে, আমি যা বলেছি তা ইসলামের পরিপন'ী। কিন' আমি এই অভিযোগ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। কারণ, ইসলামে কিয়াস স্বীকৃত। কিয়াস বলতে বুঝায়, দুইটি বিষয় বা বস'র মধ্যে তুলনা করে সিদ্ধানে- আসা। পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের অতীতের মধ্যে তুলনা করে কেউ যদি অনুমান করেন, সেখানে সজীব বস'র উদ্ভব হতে পেরেছিল, তবে তার চিন-াকে ইসলামি চিন-ার পরিপন'ী বলে মনে করার কোনো কারণই নেই। কারণ জ্ঞৈানিকেরা যা বলছেন, তা মঙ্গলগ্রহ ও পৃথিবীর অবস'ার মধ্যে তুলনা বা কিয়াস করে বলছেন। কিয়াস বা সাদৃশ্যমূলক যুক্তি (Analogical deduction) ইসলামি যুক্তিবিদ্যায় স্বীকৃত। বৈজ্ঞানিকেরা সিদ্ধানে- আসেন সাধারণ ঐকমত্য বা ইজমার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রেও ইসলামি যুক্তিবিদ্যার সাথে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই। বিজ্ঞানে মতবাদিক গোঁড়ামির কোনো স'ান নেই। তাই নতুন কোনো তথ্য জ্ঞাত হলে জ্ঞৈানিকেরা তা খোলা মনে মেনে নেন। যদি তারা দেখেন যে, নতুন তথ্য তাদের পুরনো কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত মতবাদের সাথে মিলছে না, তখন তারা নতুন করে ভাবতে আরম্ভ করেন। প্রয়োজনে দেন পুরনো মতবাদকে বাতিল করে। এমন একটি সম্ভাবনা খুব সম্প্রতি দেখা দিয়েছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে। আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে কোনো কিছুর গতিবেগ আলোকের গতিবেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। কিন' এখন দেখা যাচ্ছে যে, নিউট্রিনোর গতিবেগ আলোর কণা ফোটনের চাইতে অধিক হতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ভিত্তিহীন হয়ে উঠতে চাচ্ছে। বিজ্ঞানের দু’টি দিক আছে। একটি হলো জ্ঞানের দিক আর একটি হলো সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণসাধনের দিক। মানুষ এক সময় জানত না, মানুষের অনেক রোগের কারণ হলো রোগজীবাণু। কিন' আমরা এখন জানি, রোগজীবাণু মানুষের অনেক রোগের কারণ। আর তাই চাই রোগজীবাণুকে নিয়ন্ত্রণ করে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে। আমাদের দেশের ইতিহাস থেকে একটা দৃষ্টান- নেয়া যেতে পারে। হিন্দুরা মনে করতেন, কলেরা বা ভেদবমি রোগ হয় ওলাইচণ্ডী দেবীর প্রকোপে। বাংলাদেশের মুসলিম চিন-ায়ও পড়েছিল এর প্রভাব। ওলাইচণ্ডীকে মুসলমানেরা বলতেন ওলাবিবি। ওলাবিবি যাতে কোনো ক্ষতি করতে না পারে, যে জন্য মৌলভীরা করতেন ঘরবন্ধ। এই ঘরবন্ধ করতে গিয়ে তারা বলতেন- আল্লাহ হলেন তালা, মুহাম্মদ হলেন খিল, আমার ঘর বন্ধ করেন ফিরিশতা জিব্রাঈল। কিন' এখন আর আমরা এভাবে ঘরবন্ধ করি না। কলেরার জীবাণুমুক্ত পানি ও অন্যান্য খাবার খেয়ে চাই কলেরার জীবাণুর আক্রমণ থেকে মুক্ত হতে। কলেরার আক্রমণ হলে আমরা গ্রহণ করি ওরস্যালাইন। কলেরা এখন আর মারাত্মক রোগ নয়। এ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকদের গবেষণা আমাদের বিরাট কল্যাণ করতে পেরেছে। আমি তাই মনে করি, ধর্মবিশ্বাস ও বিজ্ঞানকে একত্র করে ভাবতে যাওয়া ঠিক নয়। ধর্ম আর বিজ্ঞানের জগৎ হলো বিশষভাবেই আলাদা। অনেক দিন আগে বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ (১১২৬- ১১৯৮ খ্রি:) এ কথা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি দেন তার দুই সত্যের মতবাদ (Doctrine of twofold truth) যাতে তিনি বলতে চান যে, দর্শন বা বিজ্ঞানের সত্যের সাথে ধর্মের সত্যকে এক করে দেখা যাবে না। আমাদের চিন-ার ক্ষেত্রে এই দুই জগৎকে রাখতে হবে পৃথক করে। ইবনে রুশদের প্রভাব ইউরোপে আনে নবজাগরণ। ইউরোপে মানুষ এগিয়ে চলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়। যার জের এখনো চলছে। মুসলিমবিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ার একটা কারণ হলো ধর্মীয় গোঁড়ামির উত্থান। এ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। ধর্মের নামে বিজ্ঞানের বিরোধিতা করলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। বিজ্ঞানের অগ্রগতি অন্য অনেক দেশে হতে পারলেও আমাদের দেশে হতে পারবে না। যেটা হয়ে উঠবে যথেষ্ট ক্ষতিরই কারণ।

আমার জীবন কেটেছে কঠোর জীবন সংগ্রাম করে। ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ আমার সেভাবে হয়নি। তবুও এ বিষয়ে জানার কিছুটা যে চেষ্টা করিনি তা নয়। যত দূর জানি, বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইমাম আল-গাজ্জালি (মৃত্যু-১১১১) তার বিখ্যাত মিশকাত-উল-আনওয়ার নামক গ্রনে' বলেছেন- কুরআন শরিফের সূরা নূর-এর ৩৫ নম্বর আয়াতের অর্থ হতে পারে ৭০ হাজার। আমরা জানি, কুরআন শরিফে আছে ৬৬৬৬ আয়াত। তাই কুরআন শরিফের বিভিন্ন অংশের অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক সেটা নির্ণয় করা সহজ নয়। সূরা নূর-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ হলেন ‘আলোর আলো’। এ কথার একটা অর্থ এই হতে পারে যে, আল্লাহ হলেন সব শক্তির শেষ উৎস। কুরআন শরিফে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ হজরত আদমকে কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করার পর তার মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেন তাঁর (আল্লাহর) আপন নিঃশ্বাস ( সূরা- ১৫:২৯)। এ কথা পড়ে আমার মনে হয়েছে, মানুষের মধ্যে আছে আল্লাহর সৃজনী শক্তির অংশ। যাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ পারে তার আপন সমস্যার সমাধান করতে। মানুষকে তাই আত্মশক্তিতে আস'াশীল হতে হবে। যেটার অভাব আমাদের দেশে যথেষ্ট হতে দেখা যাচ্ছে। আমাদের সমস্যার সমাধান আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। বাঁচতে হবে আত্মনির্ভরশীল হয়ে।
ভারতের প্রচারমাধ্যম প্রচার করে চলেছে যে, বাংলাদেশে ইসলামি মৌলবাদীরা অগণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চাচ্ছে। ইসলামি মৌলবাদ কথাটা বিশেষভাবেই অর্থহীন। কারণ কুরআন শরিফে বলা হয়েছে, ধর্মের নামে কোনো জবরদসি- নেই (সূরা-২:২৫৬)। বলা হয়েছে, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে ( সূরা-৫:৮০)। বলা হয়েছে, মানুষকে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে ধর্মের কথা বোঝাতে। কুরআন শরিফে বলা হয়েছে, সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান- নিতে (সূরা-৪২: ৩৮)। ইসলাম কোনো স্বৈরশাসনে উৎসাহ জোগায় না। তবে ইসলামে জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে বলা হয়েছে। জিহাদ ইসলামে জায়েজ। কিন' এ ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আক্রমণকারীকে পছন্দ করেন না এবং তোমরা জিহাদে মাত্রা ছাড়িও না (সূরা-২:১৯০)। রাজনীতির ক্ষেত্রে আসে সামাজিক মূল্যবোধের প্রশ্ন। ইসলামে বলা হয়েছে, জনকল্যাণের নীতি (ইসতিসলাহ) অনুসরণ করতে। ইসলামের মধ্যে সম্পৃক্ত রয়েছে কল্যাণব্রতী রাষ্ট্রের ধারণা। ইউসুফ আ:-এর কাহিনীতে আমরা দেখতে পাই যে, মিসরের রাজা (ফেরাউন) তাকে ধর্মগোলার ভার দিয়েছিলেন, যাতে করে দুর্ভিক্ষের সময় ধর্মগোলায় সঞ্চিত খাদ্যশস্য অভাবী মানুষদের মধ্যে ঠিকমতো বণ্টিত হতে পারে। ইসলামি শসনব্যবস'ায় তাই বলা হয় ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’। মানুষ সৎ না হলে কল্যাণব্রতী রাষ্ট্র সাফল্য পেতে পারে না। ইসলামি রাষ্ট্রচিন-ার একটা নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। একে মৌলবাদ বলে চিহ্নিত করতে যাওয়া ভুল। বাংলাদেশে মুসলিম চিন-াবিদেরা মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত হতে পারেন না। কারণ, বাংলাদেশে অনেক ইসলামপন'ী দল আছে। কেবল একটি ইসলামপন'ী দল নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত নয়। বাংলাদেশের ইসলামপন'ীরাও চান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র। চান রাজনৈতিক দল গড়ার স্বাধীনতা। তারা একদলীয় শাসনব্যবস'াকে সমর্থন দিচ্ছেন না। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ইসলামি দল হলো জামায়াতে ইসলামী। এই দল বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলছে। এই দলের ভূতপূর্ব আমির গোলাম আযমকে এখন যুদ্ধাপরাধী বলে বিচার করা হচ্ছে। কিন' তিনি যুদ্ধাপরাধের সাথে কতটা জড়িত ছিলেন, সেটা নিয়ে থাকছে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ। বলা হচ্ছে, তিনি চাননি সাবেক পাকিস-ান ভেঙে যাক। কিন' এই না চাওয়াটা যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে না। যুদ্ধাপরাধের আছে কতগুলো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা। যেমন বন্দীকে হত্যা করা যুদ্ধাপরাধ। গোলাম আযম কোনো বন্দীকে হত্যা করতে বলেছিলেন অথবা হত্যায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এ রকম প্রমাণ উত্থাপন করতে হবে যুদ্ধাপরাধ বিচারের আদালতে। কিন' সেটা কি আসলেই করা হবে? মনে হচ্ছে বিচারের আগেই যেন শাসি- প্রদান হয়ে গেছে। আমার মনে পড়ে, ১৯৪৮-এর কথা। গোলাম আযম সে সময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছিলেন অকুণ্ঠভাবে। তিনি তখন জামায়াতে ইসলামের সদস্য ছিলেন না। গোলাম আযম জামায়াতে ইসলাম করলেও চেয়েছেন সংসদীয় শাসনব্যবস'া; মুজতাহিদদের ইজমানির্ভর শাসনব্যবস'াকে নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট নই। কিন' বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা আমাকে যথেষ্ট চিনি-ত করে তুলেছে। আমি মনে করি, আমাদের জাতীয় সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞান পথ দেখাতে পারে। কারণ বিজ্ঞান কোনো ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধান অথবা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বিজ্ঞান আবেগনির্ভর নয়। বিজ্ঞান বিশ্লেষণনির্ভর। বিজ্ঞান ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে মুসলিমবিশ্বে যে চিন-ার সমস্যার উদ্ভব হতে পারছে, এক সময় খ্রিষ্টানবিশ্বেও তা হতে পেরেছিল। ব্রিটিশ দার্শনিক স্টুয়ার্ট মিল ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বলেন, উন্নত ধর্মবিশ্বাসের মূল কথা হলো মানুষের জন্য মানুষের সহানুভূতির 
চর্চা। বিজ্ঞানের নামে একে খাটো করে দেখা উচিত হবে না। 
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

শেয়ারবাজার বংলাদেশের মূল পুঁজিবাজার নয়



২০১২-০৩-০৬

শেয়ার বলতে সাধারণভাবে বোঝায় যৌথ মূলধনী কোম্পানির সংগৃহীত মূলধনের একটি ক্ষুদ্র অংশকে। ধরা যাক কোনো যৌথ কোম্পানি ১০ কোটি টাকা পুঁজি হিসেবে সংগ্রহ করতে চাচ্ছে। এর জন্য সে বাজারে এক লাখ শেয়ার ছাড়তে পারে, যার প্রতিটির দাম হতে পারে এক হাজার টাকা। এই শেয়ার ক্রেতারা কিনতে পারে শেয়ারবাজার (স্টক এক্সচেঞ্জ) থেকে। শেয়ারবাজার বলতে সাধারণভাবে বোঝায় এমন জায়গা, যেখানে যৌথ মূলধনী কোম্পানির শেয়ার বা অংশ বেচাকেনা হয়। মানুষ কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনে ওই কোম্পানির কারবারের লাভের অংশ বা ডিভিডেন্ট পাওয়ার জন্য। এর মধ্যে দোষের কিছু থাকে না। কিন' শেয়ারবাজারে শেয়ার কেনাবেচা এমন একটা পৃথক ব্যবস'া হয়ে দাঁড়ায়, যাতে যুক্ত হতে পারে অনেক অনিয়ম আর সেই সাথে দুর্নীতি। শেয়ার কেনাবেচার দালাল (অ্যাজেন্ট) বলতে বোঝায় তাদের, যারা হলেন শেয়ারবাজারের সদস্য, যাদের থাকে শেয়ারবাজারে বৈধভাবে শেয়ার কেনাবেচার অধিকার। শেয়ারবাজারে কেবল সেসব কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হতে পারে, যাদের শেয়ারবাজারের পরিচালকমণ্ডলী দান করেন অনুমোদন। অননুমোদিত কোনো কোম্পানির শেয়ার কোনো বিশেষ শেয়ারবাজারে বিক্রি হতে পারে না। শেয়ারবাজারের পরিচালকেরা কোনো কোম্পানি সম্পর্কে বিশেষভাবে নিশ্চিত না হলে কোনো শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ার বিক্রির অনুমোদন দেয় না। শেয়ারবাজারের দালাল হতে হলে শেয়ারবাজারের সদস্য হতে হয়। কেবল শেয়ারবাজারের সদস্যরাই পারেন শেয়ার কেনাবেচা করতে। শেয়ারবাজারের সভ্য (দালাল) ছাড়া আর কেউ শেয়ারবাজারে প্রবেশের অধিকারী নন। তবে শেয়ারবাজারের কাছে শেয়ারবাজারের দালালদের অফিস থাকে, যেখানে যেয়ে সহজেই তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায় এবং তাদের মাধ্যমে করা সম্ভব হয় শেয়ার কেনাবেচা। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে প্রবেশ করবার জন্য ৬ মাসমেয়াদি টিকিট কেনা চলে। এভাবে টিকিট কিনেও শেয়ারবাজারের দালালদের সাথে যোগাযোগ করে শেয়ার কেনাবেচা সম্ভব। শেয়ার কেনাবেচা শেষ পর্যন- দাঁড়ায় ফটকাবাজারিতে। ফটকাবাজারি বলতে বোঝায় শেয়ার কেনাবেচা করে লাভবান হওয়ার চেষ্টাকে। শেয়ারবাজার শেষ পর্যন- হয়ে দাঁড়ায় একটা ফটকাবাজারের কেন্দ্র। ফটকা দুই রকমের হতে পারে। এক রকম ফটকা হলো, কম দামে শেয়ার কিনে সেই শেয়ারের দাম বাড়লে বিক্রি করে লাভ করা। আর এক রকম ফটকা হলো, কোনো কোম্পনির শেয়ার পরে কম দামে কেনা যাবে এ কথা ভেবে আগে বিক্রি করা। এ ক্ষেত্রে শেয়ার বিক্রি না করে বাজি ধরা হয়। যদি কোনো কোম্পানির শেয়ার পরে কম দামে বিক্রি না হয়, তবে যে শেয়ার না কিনে আগাম বিক্রি করে তাকে বিপাকে পড়তে হয়। কম দামে শেয়ার কিনে পরে ওই শেয়ারের দাম বাড়লে তা বিক্রি করে যারা লাভবান হতে চান তাদের বলে তেজিওয়ালা। ইংরেজিতে বলে বুল (Bull)। আর যারা ভবিষ্যতে কোনো কোম্পানির শেয়ার কম দামে বিক্রি হবে এটা ভেবে আগাম বিক্রি করে তাদের বলা হয় মন্দিওয়ালা। মন্দিওয়ালাদের ইংরেজিতে বলে বেয়ার (Bear)। শেয়ারবাজার হয়ে দাঁড়ায় তেজিওয়ালা ও মন্দিওয়ালাদের লীলাক্ষেত্রে। শেয়ারবাজারে কেনাবেচা করে খুব বেশি লোক লাভবান হতে পারেন না। শেয়ারবাজার হয়ে দাঁড়ায় কতকটা জুয়া খেলার মতো। জুয়া খেলার মতোই হলো শেয়ারবাজারের শেয়ার কেনাবেচার আকর্ষণ। আমি কখনোই শেয়ার কেনাবেচা করিনি। আমার এক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ইংরেজ আমলে কলকাতা শেয়ারবাজারে কেনাবেচা করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমি থেকেছি শেয়ারবাজার থেকে দূরে। শেয়ারবাজার আমার কাছে মনে হয়েছে একটা ভয়ঙ্কর অনিশ্চিত স'ান। হঠাৎ বড়লোক হওয়ার চিন-া আমার ছিল না। আর এখনো নেই। অনেকে শেয়ারবাজারে ফটকাবাজারি করেন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। শেয়ারবাজারে ধস নামলে শোধ হতে পারে না ব্যাংকঋণ। অনেক ব্যাংক ফেল পড়ে এ রকম ঋণ দেয়ার কারণে। বিশেষ করে ছোট ব্যাংকগুলো। তবে বড় ব্যাংকও ফেল পড়তে পারে। আর দেশে দেখা দিতে পারে অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়। ১৯২৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ রকম বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্টি হয়েছিল মহামন্দা। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবার দেখা দিয়েছে মহামন্দা না হলেও বড় রকমের মন্দা, যার একটা কারণ হলো ব্যাংক কর্তৃক বিষাক্ত ঋণ প্রদান। বিষাক্ত ঋণ বলতে বোঝায়, যে ঋণ শোধ হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি তৈরির কোম্পানি বাজারে অনেক শেয়ার ছাড়ে। এসব শেয়ার বিক্রি হয় প্রচুর। বাড়ি তৈরির কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি বাড়ি তৈরি করে ফেলে। বাড়ি বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরির কোম্পানির শেয়ার যারা কিনেছিলেন তাদের পক্ষে ব্যাংক ঋণ শোধ দেয়া সম্ভব হয় না। এটা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান মন্দা সৃষ্টি হওয়ার একটা কারণ। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর ইউরোপের অর্থনীতি বিশেষভাবে নির্ভরশীল, তাই সেখানেও এসে পড়েছে বড় রকমের মন্দার প্রভাব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত সাপ্তাহিক টাইম পত্রিকার ২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সংখ্যায় একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজার হলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই ঝুঁকির মাত্রা কমার কোনো লক্ষণ আপাতত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কারণ, বিশ্বজুড়ে চলছে বাণিজ্যমন্দা। নিকট ভবিষ্যতে যার মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। এর এর ফলে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কমতে পারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের চাহিদা। এই চাহিদা কমে যাওয়া বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে করে তুলতে পারে আরো অনেক বেশি অনিশ্চিত। শেয়ারবাজার নিয়ে অনেক দেশেই উঠছে প্রশ্ন। শেয়ারবাজারকে কি আসলেই বলা যায় পুঁজির বাজার? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজার অবসি'ত নিউ ইয়র্ক শহরের ওয়াল স্ট্রিটে। একদল মার্কিন নাগরিক এখন চাচ্ছেন এই শেয়ারবাজারের বিলুপ্তি। তারা বলছেন, ওয়াল স্ট্রিট দখল করো। তারা চাচ্ছেন ফটকাবাজারি অর্থনীতির অবসান। আমি শেয়ার কেনাবেচার বিরোধী নই। কিন' একে নির্ভর করে যে ভয়ঙ্কর ফটকাবাজারি সৃষ্টি হতে পারে, আমি তার ঘোর বিরোধী। বাংলাদেশে আগে শেয়ারবাজার ছিল না। এখন হয়েছে। কিন' এই শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে ক্ষতিকর ফটকাবাজারি।
আমাদের দেশ এখনো মূলত কৃষিনির্ভর। আমাদের দেশের অর্থনীতি এখনো হয়ে আছে বস'ত কৃষি অর্থনীতি। আমাদের দেশের শেয়ারবাজারকে পুঁজির বাজার হিসেবে যে রকম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে আসলে তার সে রকম গুরুত্ব নেই। কারণ শেয়ারবাজারের টাকা এসে মূলধন হিসেবে খাটতে পারছে না আমাদের কৃষি অর্থনীতিতে। আমার মনে হয় এ দেশের কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত সমবায় সমিতিভিত্তিক কৃষি ব্যাংক। কৃষিতে উন্নতি ঘটলে বাড়বে কৃষিজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। আর তাই আমরা নানা জিনিস উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারব তাদের কাছে। অর্থাৎ ঘটতে পারবে আমাদের অভ্যন-রীণ বাজারের বিশেষ সম্প্রসারণ, যেটা পাওয়া উচিত আমাদের অগ্রাধিকার। শেষ পর্যন- খেয়ে-পরে বাঁচতে হয় মানুষকে। আর এই খেয়ে-পরে বাঁচা নির্ভর করে একটা দেশের মাটির ওপর।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট

সমুদ্র আইন



২০১২-০৩-২৬

আন-র্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫)। জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সঙ্গতি রেখে। মানুষ বাস করে স'লে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ জাতির অধিকারের ব্যাপার হতে পারে না। সমুদ্রে থাকতে হবে সব জাতির জাহাজ চলাচলের সমান অধিকার। কিন' একটা দেশের কাছে অবসি'ত সমুদ্রে কিছু দূর পর্যন- থাকা উচিত সে দেশের কর্তৃত্ব। কারণ তা না থাকলে সমুদ্রতীরবর্তী দেশটির নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। প্রত্যকটি জাতি চায় তার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা চাওয়া হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। যেকোনো আইনে তাই একে নিতে হবে বিশষ বিবেচনায়। গ্রোশিয়াসের এই প্রাকৃতিক নিয়মের ধারণা নিয়ে সূত্রপাত ঘটে সমুদ্র আইনের। ঠিক হয় একটা সমুদ্রতীরবর্তী দেশ, সেই দেশ থেকে কামানের গোলা ছুড়লে তা যত দূর যেয়ে পড়বে, সেই দূরত্বের মধ্যে সমুদ সীমানা হবে তার নিজের। সেখানে থাকবে তার কর্তৃত্ব। সে সময় কামানের গোলা খুব বেশি দূর যেত না। সাধারণত কামানের পাল্লা ছিল পাঁচ কিলোমিটারের মতো। কিন' ক্রমেই কামানের পাল্লা বাড়তে থাকে। আর সমুদ্র আইনে দেখা দেয় জটিলত। এখন একটা দেশের সমুদ্র নিয়ে হয়েছে অনেক সুস্পষ্ট আইন। আইন না বলে একে আসলে বলা উচিত কনভেনশন বা প্রথা। গঠিত হয়েছে বিশেষ আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনাল : International Tribunal for the Law of the Sea, সংক্ষেপে (ITLOS)। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই এই ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত। এই দুই দেশই মেনে নিয়েছে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের অধিকার। 

বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার জন্য এই ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিল মিয়ানমারের বিপক্ষে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবরে। মামলার রায় এখন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বিরোধ ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র এলাকা নিয়ে। আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার। আর মিয়ানমার পেয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার। আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এই রায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে। এই রায়ে এই দুই দেশের কেউ-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হারজিত হয়নি কারো। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক কারণে বলছে, এই রায়ে বাংলাদেশ জিতেছে। কিন' বাস-বে তা হয়নি।

সমুদ্রতীরবর্তী একটা দেশের ভূমির কিছুটা অংশ থাকে সমুদ্রের পানির মধ্যে। এখানে সমুদ্রের গভীরতা সাধারণত থাকে ১৮০ মিটারের কাছাকাছি। সমুদ্রের পানির মধ্যে একটা দেশের ডুবে থাকা এই অংশকে বলে মহীসোপান (Continental Shelf)। মহীসোপান ঢালুভাবে নেমে যায় সমুদ্রের মধ্যে। এই ঢালু জায়গাকে বলা হয় মহীঢাল (Continental Slope)। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে দু’ভাবে। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে সমদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়। বিশেষ করে ঝড়ের সময় সমুদ্রের ঢেউ ডাঙার যে অংশে এসে আছড়ে পড়ে সেই অংশে। কারণ, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ডাঙার এই অংশ ক্ষয় হয়। এখানে এসে জমতে পারে সমুদ্রের পানি অগভীরভাবে। আবার মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে জমে। আমাদের দেশে সমুদ্র উপকূলে মহীসোপান প্রসে' বেড়ে চলেছে। এটা হতে পারছে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে এসে জমার ফলে। পলিমাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছে সমুদ্র। ফলে বাড়ছে বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ। বাংলাদেশ সমুদ্রের যে অংশ পেল, নদীবাহিত পলিমাটি জমে সমুদ্র ভরাট হয়ে একদিন সেখানে জেগে উঠবে মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি। সেটা হবে বাংলাদেশেরই অংশ। আপাতত সমুদ্রের যে এলাকা আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ পেতে পারল, সেখানে বাংলাদেশের জেলেরা যেয়ে অবাধে মাছ ধরতে পারবে, যা অনেক পরিমাণে পূরণ করবে বাংলাদেশের মৎস্যের চাহিদা। সমুদ্রের পানির নিচে এখন যে অংশ আছে, সেখানে পাওয়া যেতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল, যা উঠাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি হতে পারবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

ভারতের সাথেও সমুদ্রসীমা নিয়ে আমাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেনি। কারণ ভারত চায়নি এই ট্রাইব্যুনালে যেতে। বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হেগে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ বা আন্তর্জাতিক সালিস আদালতে। এই আদালত যে রায় দেবে ভারত তা না-ও মানতে পারে। কারণ কোনো দেশ এই আদালতের সালিস মানতে সেভাবে বাধ্য নয়। বাংলাদেশ তাই আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার সমুদ্রের ওপর অধিকার যেভাবে পেতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক সালিস আদালতে তা পেতে পারবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ আন-র্জাতিক সালিস আদালতে যেয়ে ভুল কাজ করেনি। কারণ তার নৌবহর এমন শক্তিশালী নয় যে, সে সামরিক শক্তিবলে ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমাদের তাই নির্ভর করতে হবে আন-র্জাতিক সালিস আদালতেরই ওপর।

মিয়ানমার ও ভারতের ইতিহাস ভিন্ন। মিয়ানমার বা বার্মা একসময় ছিল ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। যেমন প্রদেশ ছিল বাংলা। মিয়ানমার ছিল ব্রিটিশ-ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কিন' মিয়ানমার ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়। থাকে না আর ব্রিটিশ-ভারতের একটি প্রদেশ হয়ে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মিয়ানমার ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ-ভারত থেকে হতে পেরেছিল পৃথক। যদি সে এভাবে পৃথক হতে না পারত তবে ভারত হয়তো এখন দাবি করত মিয়ানমারকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। যেমন সে দাবি করছে উত্তর-পূর্ব ভারতকে। 

মিয়ানমারের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমান- রয়েছে। কিন' বাংলাদেশকে যেমন ভারত তিন দিক থেকে ঘিরে আছে, মিয়ানমার সেভাবে ঘিরে নেই। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বিরোধ নেই। কিন' ভারতের সাথে বাংলাদেশের আছে ঐতিহাসিক বিরোধ। মিয়ানমারের ভৌগোলিক আয়তন বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের চার গুণের বেশি। কিন' মিয়ানমার তা বলে চাচ্ছে না বাংলাদেশকে দখল করে তাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন' ভারত স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের ওপর তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। তাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে উঠছে কঠিন। ভারতের সাথে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা হওয়াও তাই যে সহজ হবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। সেখানেও দু’টি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ বাধার সৃষ্টি করতে পারে। 

মিয়ানমারের যে প্রদেশকে আমরা বলি আরাকান, আর মিয়ানমার এখন বলে রাখাইন, তার সাথে আমাদের আছে সাধারণ সীমান-। কিন' এই সীমান- নিয়ে এখন আর কোনো বিরোধ নেই। এটা নিষ্পত্তি হতে পেরেছে পাকিস-ান আমলে। আরাকানি মুসলমানদের সাধারণভাবে বলা হয় রোহিঙ্গা। সাধারণ বৌদ্ধ আরাকানি আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ বিরোধ। এই বিরোধের ফলে ১৯৯১ সালে আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস', যাদের অনেকে এখনো আরাকানে ফিরে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে এদের যাপন করতে হচ্ছে খুবই করুণ জীবন। তবে বার্মার সাথে এ নিয়ে বাংলাদেশ জড়াতে চাচ্ছে না বিবাদে। ইংরেজ শাসনামলে চট্টগ্রামের দোহাজারী রেলস্টেশন থেকে আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ স'াপনের একটা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন' এই পরিকল্পনা বাস-বায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপান মিয়ানমারকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে। আরাকানসহ সমস- মিয়ানমার ১৯৪২ সালে চলে যায় জাপানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৫ সাল পর্যন- মিয়ানমার থেকেছে জাপানের নিয়ন্ত্রণে। এরপর বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন' এখন চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের। এ রকম রেল যোগাযোগ স'াপিত হলে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে ভৌগোলিক কারণে বাড়বে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিমাণ। আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। আরাকানের সাথে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এখনো সহজ হতে পারেনি। বাংলাদেশের সাথে আরাকানের রেল যোগাযোগ হলে আরাকানে ব্যবসায়-বাণিজ্য তাই বাংলাদেশের সাথে বেড়ে যেতেই চাইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য সৃষ্টি করবে উভয়ের মধ্যে মৈত্রীর বিশেষ পরিবেশ। ভারত সম্ভবত চাচ্ছে না এ রকম মৈত্রীর বন্ধন গড়ে ওঠা। 

তাই বাংলাদেশে ভারতঘেঁষা পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিল, মিয়ানমার মানতে ইচ্ছুক নয় আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়। মিয়ানমার সৈন্যসমাবেশ করছে আরাকান-বাংলাদেশ সীমান্তে। কিন' আরাকানে এ রকম সৈন্যসমাবেশ মিয়ানমার ঘটায়নি। এটা ছিল মিথ্যা প্রচারণা। আমরা মিয়ানমারের সাথে কোনো সঙ্ঘাত চাই না। আমরা কোনো সঙ্ঘাত চাই না ভারতেরও সাথে। তাই আমরা মামলা করেছি আন্তর্জাতিক সালিস আদালতে। আইনের মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে আসতে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন আসলে কোনো আইন কি না তা নিয়ে আছে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ বিতর্ক। কারণ আন-র্জাতিক আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারী দেশকে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শাসি- প্রয়োগের ব্যবস'া করা সম্ভব হয়নি। আইনের পক্ষে শক্তির সমর্থন না থাকলে আইনের বাস-ব প্রয়োগ দুর্বল হতে বাধ্য। সমুদ্র আইন আছে, কিন' সমুদ্র আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারীকে শাসি- প্রদানের কোনো ব্যবস'া এখনো নেই। 
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

সোমবার, ১৯ মার্চ, ২০১২

ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে


পত্রিকার খবর পড়ে জানলাম, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা হয়েছে ইতিহাস বিকৃতির। তাই বিষয়টি নিয়ে আমাদের মতো অনেকের মনে জাগছে অনেক প্রশ্ন। সব দেশেই ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। তাদের ইতিহাস গবেষণা ও চর্চার ক্ষেত্রে থাকা উচিত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতাকে ধরা উচিত গণতন্ত্রের অংশ। বাংলাদেশ যদি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে থাকে তবে এই গণতান্ত্রিক অধিকারে হস-ক্ষেপ করতে যাওয়া সমীচীন বলে বিবেচনা পেতে পারে না। একটা দেশের আদালত খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন' সর্বক্ষেত্রে আদালতকে টেনে আনলে তা সৃষ্টি করতে পারে প্রভূত সমস্যা। সেটা একটা জাতির জীবনে বাঞ্ছিত হতে পারে না।
কয়েক বছর আগের ঘটনা, ভারতে কলকাতা হাইকোর্টে কলকাতার ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে একটি মামলা হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্ট এর জন্য কয়েকজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিককে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেন। এবং তাদের কাছে জানতে চান কলকাতা শহরের ইতিহাস। এসব ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা বলেন, জব চার্নব কলকাতায় কুঠিবাড়ি স'াপনের আগেই সেখানে ছিল হাটবাজার ও বর্ধিষ্ণু জনপদ। এখানে বাস করত অনেক আর্মানি খ্রিষ্টান ব্যবসায়ী। জব চার্নব তাই কলকাতাকে বেছে নিয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স'াপনের জন্য। আর্মানি খ্রিষ্টান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পেয়েছিল যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় কুঠি স'াপন না করলেও এখানে গড়ে উঠতে পারত বিশেষ ব্যবসায় কেন্দ্র। তাই বলা চলে না, জব চার্নব কলকাতা শহরের জনক। যদিও কলকাতা শহর গড়ে ওঠার পেছনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবদান খুবই বিদিত। ইংরেজরা ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে চেয়েছিল তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স'াপন করতে। কিন' নৌযুদ্ধে ইংরেজরা পর্তুগিজদের সাথে সে সময় এঁটে উঠতে পারেনি। চট্টগ্রাম থেকে যায় পর্তুগিজদের অনুকূলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় কুঠি স'াপন করে ১৬৯০ সালের কাছাকাছি। কলকাতা হাইকোর্ট তাই রায় দেন, কলকাতা শহরের জন্মদিন হিসেবে কোনো বিশেষ দিবস পালন করা যাবে না। তাদের এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা ওঠেনি। কারণ আদালত বিশিষ্ট ঐতিহাসিককে নির্ভর করে প্রদান করেন তাদের রায়।
আমাদের দেশে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে হাইকোর্টে অভিযোগ উঠেছে। আমাদের হাইকোর্ট কিভাবে এর বিচার করবেন সেটা আমরা বলে দিতে পারি না। তবে মনে হয় কলকাতা হাইকোর্টের বিচার এ ক্ষেত্রে কিছুটা নজির হতে পারে। আমাদের অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির যেই অভিযোগ উঠেছে সেটা তাদের ইচ্ছাকৃত না প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব সেটা বিচার্য হতে হবে। তারা যা বলেছেন, সেটা তাদের জ্ঞানের অভাবজনিত কারণে ঘটে থাকতে পারে। আসলে ১৯৭১ সালে প্রকৃতই কী ঘটেছিল সে সম্বন্ধে আমরা চেষ্টা করেও তথ্য সংগ্রহ করতে যে পারছি তা নয়। যেসব তথ্য পাচ্ছি তাদের সমন্বয়ে ইতিহাসের একটা সমন্বিত চিত্র এখনো পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক তথ্যই মনে হচ্ছে পরস্পরবিরোধী। যেমন ভারতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬ নভেম্বর ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্ক শহরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতায় তিনি বলেন, তিনি যত দূর জানেন, শেখ মুজিব নিজে এখন পর্যন- বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা প্রদান করেননি। শেখ মুজিবকে মুক্ত করে তার সাথে আলোচনার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শানি-পূর্ণ সমাধান তাই এখনো অসম্ভব নয়। বলা হচ্ছে, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষক। যারা এর বিপক্ষে কিছু বলবেন, ধরতে হবে তারা ইতিহাস বিকৃত করছেন। কিন' ইন্দিরা গান্ধী সত্য হলে বলতে হবে তাদের বক্তব্য ইতিহাস বিকৃতির নিদর্শন নয়। ইন্দিরা গান্ধী সে সময়ের ঘটনা সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন। এই বক্তৃতায় ইন্দিরা গান্ধী আরো বলেন, শেখ মুজিব মার্কিনবিরোধী নন। তাই শেখ মুজিবের সাথে সহযোগিতা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারে। ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তৃতাটি সঙ্কলিত হয়েছে ÔIndia Speaks’ নামক বইয়ে। বইটি সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ভারতের প্রচার দফতর থেকে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে।
শেখ মুজিব ব্যক্তিগতভাবে কী চেয়েছিলেন সেটা অনুমান করা যথেষ্ট কঠিন। শেখ মুজিব পাকিস-ান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে যান। পাকিস-ান থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি সরাসরি বাংলাদেশে আসেননি। তিনি কেন লন্ডনে গিয়েছিলেন সেটা যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। লন্ডনে তিনি বিলাতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী হিথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কেন এই সাক্ষাৎকারকে প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন আমরা তা জানি না। সাংবাদিক অ্যানথোনি ম্যাসকারেনহ্যাস তার বহুল পঠিত Bangladesh, A Legacy of Blood বইয়ে বলেছেন- শেখ মুজিব তাকে লন্ডনে বলেন, তিনি (শেখ মুজিব) পাকিস-ানের সাথে সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছেন না। তিনি পাকিস-ানের সাথে বিশেষ ধরনের সম্পর্ক (Some link) রাখার পক্ষে। এই বিশেষ ধরনের সম্পর্ক কী হবে সেটা তিনি ঠিক করবেন বাংলাদেশে যাওয়ার পর। তিনি এই বিষয়ে আলোচনা করবেন তার দলের আর সব নেতার সাথে। তারপর তিনি এই বিষয়ে গ্রহণ করবেন সিদ্ধান-। ম্যাসকারেনহ্যাস সত্যি হলে বলতে হবে শেখ মুজিব চাননি পাকিস-ানের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে। বরং চেয়েছিলেন, পাকিস-ানের সাথে একটা বিশেষ রকমের সম্পর্ক বজায় রাখতে। কিন' এখন বলা হচ্ছে, পাকিস-ানের সাথে শেখ মুজিব চেয়েছিলেন সব সম্পর্কের বিচ্ছেদ। মার্কিন পত্রপত্রিকায় এ সময় খবর বেরিয়েছিল যে, বাংলাদেশ চাচ্ছে পাকিস্তানের সাথে একটা বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখতে। শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর তার সাথে নানা বিষয়ে তাজউদ্দীনের গুরুতর মতপার্থক্য হতে দেখা যায়। তাজউদ্দীনের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি (তাজউদ্দীন) হলেন ভারতের চর। তিনি ভারতের সাথে এমন সব গোপন চুক্তি করেছেন, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন'ী। শেখ মুজিব তাজউদ্দীনকে বাদ দেন তার মন্ত্রিসভা থেকে। তাজউদ্দীন ভারতে গিয়ে গড়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। এতে শেখ মুজিবের কত দূর সম্মতি ছিল তা বলা যায় না। তাই বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হয়ে আছে যথেষ্ট কষ্টসাপেক্ষ। এ বিষয়ে ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেকেই করতে পারেন ভুল। কিন' এই ভুলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। ধরতে হয়, না জানার কারণেই এই ভুল ঘটতে পারছে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান মোশতাকের পর ক্ষমতায় আসেন। জিয়াউর রহমান যখন দিল্লি সফরে যান তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোরারজি দেশাই। ভারতের প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিলম সঞ্জীব রেড্ডি। ভারতের প্রেসিডেন্ট রেড্ডি দিল্লি বিমানবন্দরে জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানান। তিনি তার স্বাগত ভাষণে জিয়াউর রহমানকে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশর স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। ভারতের প্রেসিডেন্টের এই উক্তিকে সত্যি বলে ধরলে জিয়াকে বলতে হয় স্বাধীনতার ঘোষক। আমাদের কোনো ঐতিহাসিক যদি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলতে চান, তাকে বলা যাবে না অপরাধী। কারণ ভারতের প্রেসিডেন্ট একজন খুবই নির্ভরজনক ব্যক্তি। অবশ্য তার বক্তব্যেও ভুল থাকা সম্ভব। ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে আমাদের অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার বিচার করতে হলে ইন্দিরা গান্ধীর এবং ভারতের প্রেসিডেন্টের দেয়া ভাষণকে বিবেচনায় নিতে হবে। আদালত কী রায় দেবেন আমরা সে বিষয়ে কোনো অনুমান করতে চাই না। কিন' বাইরে রাজপথে অনেক কিছুই ঘটছে।
আমরা ১২ মার্চ দেখলাম খলেদা জিয়ার ডাকে বিপুল জনসমাগম ঘটতে। বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই সরকার নিঃসন্দেহে জিয়াকে আবার ঘোষণা করবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তখন আর বজায় থাকবে না। এটা সহজেই অনুমান করা চলে। ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে যে মামলা উঠেছে সেটা না ওঠা ছিল ভালো। এতে দেশবাসীর মনে সৃষ্টি হতে পারছে নানা বিভ্রান্তি।
এই লেখাটি শেষ হওয়ার পর জানতে পারলাম অধ্যাপকদের বিপক্ষে যে মামলাটি করা হয়েছিল সেটি খারিজ করে দেয়া হয়েছে। খবরটি জেনে খুব খুশি হলাম। একসময় আমিও অধ্যাপক ছিলাম আর তাই অধ্যাপকদের এভাবে বিচার করা আমার কাছে মনে হচ্ছিল খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। সর্বোপরি এসব অধ্যাপক এমন কিছু লেখেননি যা ইতিহাসের খুবই বরখেলাপ। আমি আমার লেখায় যা প্রমাণ করতে চেয়েছি, তাই হয়তো এই লেখাটির এখনো কিছু মূল্য আছে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট