শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

বিজ্ঞান ও সমকালীন ইসলামি চিন-া



২০১২-০২-২০

বৈজ্ঞানিকদের চিন-ার মূলে একটা বিশেষ বিশ্বাস কাজ করে। এই বিশ্বাসকে বলে প্রাকৃতিক নিয়মের একানুবর্তিতা (Principle of Uniformity of Nature)। এই বিশ্বাস ছাড়া বিজ্ঞান দাঁড়াতে পারে না। এক বায়ুচাপমাত্রার পানিকে ফুটাতে হলে সর্বত্রই লাগবে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। না হলে পানি ফুটবে না। এ হলো প্রাকৃতিক নিয়মের একানুবর্তিতার একটা সাধারণ দৃষ্টান-। এই বিশ্বাসকে বাদ দিয়ে জ্ঞৈানিকদের চিন-াভাবনা অগ্রসর হতে পারে না। আমি মঙ্গলগ্রহ থেকে আসা প্রস-রখণ্ড নামক প্রবন্ধে (২৩ জানুয়ারি ২০১২) বলেছিলাম, কতগুলো অনুকূল প্রাকৃতিক অবস'ার সমাবেশে প্রাণের আবির্ভাব সম্ভব। এটা আমার কোনো নিজের কথা নয়। এটা হলো বৈজ্ঞানিকদের সাধারণ বিশ্বাসের ব্যাপার। মো: বেলাল খান এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন- আমার বক্তব্য ইসলামি ধর্মচিন্তার পরিপন'ী। কিন' তা হলো বৈজ্ঞানিক চিন-ার সাধারণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমি কারো ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করার কথা আদৌ ভাবিনি। বৈজ্ঞানিক চিন-ার একটা ছক গড়ে উঠেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বিখ্যাত ফরাসি বৈজ্ঞানিক লাভোয়াজিয়ে বলেন- যাকে বলা হয় জীবন, তা আসলে হলো কতগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমষ্টিমাত্র। তার বক্তব্যকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের জগতে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা পেতে পেরেছে যে, জীবনের বাস্তবতার মূলে যেসব রাসায়নিক বিক্রিয়া আছে, যেখানেই তারা ঘটতে পারবে সেখানেই উদ্ভব হবে প্রাণবান বস'। বৈজ্ঞানিকেরা মনে করেছেন, বহু বছর আগে মঙ্গলগ্রহের অবস'া ছিল পৃথিবীর অনুরূপ। সেখানে তাই ঘটতে পেরেছে পৃথিবীর অনুরূপ রাসায়নিক বিক্রিয়া। আর তার ফলে সেখানে উদ্ভূত হতে পেরেছে সজীব বস'। মো: বেলাল খানের মতে, আমি যা বলেছি তা ইসলামের পরিপন'ী। কিন' আমি এই অভিযোগ গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। কারণ, ইসলামে কিয়াস স্বীকৃত। কিয়াস বলতে বুঝায়, দুইটি বিষয় বা বস'র মধ্যে তুলনা করে সিদ্ধানে- আসা। পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের অতীতের মধ্যে তুলনা করে কেউ যদি অনুমান করেন, সেখানে সজীব বস'র উদ্ভব হতে পেরেছিল, তবে তার চিন-াকে ইসলামি চিন-ার পরিপন'ী বলে মনে করার কোনো কারণই নেই। কারণ জ্ঞৈানিকেরা যা বলছেন, তা মঙ্গলগ্রহ ও পৃথিবীর অবস'ার মধ্যে তুলনা বা কিয়াস করে বলছেন। কিয়াস বা সাদৃশ্যমূলক যুক্তি (Analogical deduction) ইসলামি যুক্তিবিদ্যায় স্বীকৃত। বৈজ্ঞানিকেরা সিদ্ধানে- আসেন সাধারণ ঐকমত্য বা ইজমার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রেও ইসলামি যুক্তিবিদ্যার সাথে বিজ্ঞানের কোনো বিরোধ নেই। বিজ্ঞানে মতবাদিক গোঁড়ামির কোনো স'ান নেই। তাই নতুন কোনো তথ্য জ্ঞাত হলে জ্ঞৈানিকেরা তা খোলা মনে মেনে নেন। যদি তারা দেখেন যে, নতুন তথ্য তাদের পুরনো কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত মতবাদের সাথে মিলছে না, তখন তারা নতুন করে ভাবতে আরম্ভ করেন। প্রয়োজনে দেন পুরনো মতবাদকে বাতিল করে। এমন একটি সম্ভাবনা খুব সম্প্রতি দেখা দিয়েছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে। আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে কোনো কিছুর গতিবেগ আলোকের গতিবেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। কিন' এখন দেখা যাচ্ছে যে, নিউট্রিনোর গতিবেগ আলোর কণা ফোটনের চাইতে অধিক হতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ভিত্তিহীন হয়ে উঠতে চাচ্ছে। বিজ্ঞানের দু’টি দিক আছে। একটি হলো জ্ঞানের দিক আর একটি হলো সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণসাধনের দিক। মানুষ এক সময় জানত না, মানুষের অনেক রোগের কারণ হলো রোগজীবাণু। কিন' আমরা এখন জানি, রোগজীবাণু মানুষের অনেক রোগের কারণ। আর তাই চাই রোগজীবাণুকে নিয়ন্ত্রণ করে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে। আমাদের দেশের ইতিহাস থেকে একটা দৃষ্টান- নেয়া যেতে পারে। হিন্দুরা মনে করতেন, কলেরা বা ভেদবমি রোগ হয় ওলাইচণ্ডী দেবীর প্রকোপে। বাংলাদেশের মুসলিম চিন-ায়ও পড়েছিল এর প্রভাব। ওলাইচণ্ডীকে মুসলমানেরা বলতেন ওলাবিবি। ওলাবিবি যাতে কোনো ক্ষতি করতে না পারে, যে জন্য মৌলভীরা করতেন ঘরবন্ধ। এই ঘরবন্ধ করতে গিয়ে তারা বলতেন- আল্লাহ হলেন তালা, মুহাম্মদ হলেন খিল, আমার ঘর বন্ধ করেন ফিরিশতা জিব্রাঈল। কিন' এখন আর আমরা এভাবে ঘরবন্ধ করি না। কলেরার জীবাণুমুক্ত পানি ও অন্যান্য খাবার খেয়ে চাই কলেরার জীবাণুর আক্রমণ থেকে মুক্ত হতে। কলেরার আক্রমণ হলে আমরা গ্রহণ করি ওরস্যালাইন। কলেরা এখন আর মারাত্মক রোগ নয়। এ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকদের গবেষণা আমাদের বিরাট কল্যাণ করতে পেরেছে। আমি তাই মনে করি, ধর্মবিশ্বাস ও বিজ্ঞানকে একত্র করে ভাবতে যাওয়া ঠিক নয়। ধর্ম আর বিজ্ঞানের জগৎ হলো বিশষভাবেই আলাদা। অনেক দিন আগে বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদ (১১২৬- ১১৯৮ খ্রি:) এ কথা বোঝাতে চেয়েছেন। তিনি দেন তার দুই সত্যের মতবাদ (Doctrine of twofold truth) যাতে তিনি বলতে চান যে, দর্শন বা বিজ্ঞানের সত্যের সাথে ধর্মের সত্যকে এক করে দেখা যাবে না। আমাদের চিন-ার ক্ষেত্রে এই দুই জগৎকে রাখতে হবে পৃথক করে। ইবনে রুশদের প্রভাব ইউরোপে আনে নবজাগরণ। ইউরোপে মানুষ এগিয়ে চলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়। যার জের এখনো চলছে। মুসলিমবিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ার একটা কারণ হলো ধর্মীয় গোঁড়ামির উত্থান। এ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। ধর্মের নামে বিজ্ঞানের বিরোধিতা করলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। বিজ্ঞানের অগ্রগতি অন্য অনেক দেশে হতে পারলেও আমাদের দেশে হতে পারবে না। যেটা হয়ে উঠবে যথেষ্ট ক্ষতিরই কারণ।

আমার জীবন কেটেছে কঠোর জীবন সংগ্রাম করে। ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ আমার সেভাবে হয়নি। তবুও এ বিষয়ে জানার কিছুটা যে চেষ্টা করিনি তা নয়। যত দূর জানি, বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইমাম আল-গাজ্জালি (মৃত্যু-১১১১) তার বিখ্যাত মিশকাত-উল-আনওয়ার নামক গ্রনে' বলেছেন- কুরআন শরিফের সূরা নূর-এর ৩৫ নম্বর আয়াতের অর্থ হতে পারে ৭০ হাজার। আমরা জানি, কুরআন শরিফে আছে ৬৬৬৬ আয়াত। তাই কুরআন শরিফের বিভিন্ন অংশের অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক সেটা নির্ণয় করা সহজ নয়। সূরা নূর-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ হলেন ‘আলোর আলো’। এ কথার একটা অর্থ এই হতে পারে যে, আল্লাহ হলেন সব শক্তির শেষ উৎস। কুরআন শরিফে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ হজরত আদমকে কাদামাটি দিয়ে সৃষ্টি করার পর তার মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেন তাঁর (আল্লাহর) আপন নিঃশ্বাস ( সূরা- ১৫:২৯)। এ কথা পড়ে আমার মনে হয়েছে, মানুষের মধ্যে আছে আল্লাহর সৃজনী শক্তির অংশ। যাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ পারে তার আপন সমস্যার সমাধান করতে। মানুষকে তাই আত্মশক্তিতে আস'াশীল হতে হবে। যেটার অভাব আমাদের দেশে যথেষ্ট হতে দেখা যাচ্ছে। আমাদের সমস্যার সমাধান আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। বাঁচতে হবে আত্মনির্ভরশীল হয়ে।
ভারতের প্রচারমাধ্যম প্রচার করে চলেছে যে, বাংলাদেশে ইসলামি মৌলবাদীরা অগণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চাচ্ছে। ইসলামি মৌলবাদ কথাটা বিশেষভাবেই অর্থহীন। কারণ কুরআন শরিফে বলা হয়েছে, ধর্মের নামে কোনো জবরদসি- নেই (সূরা-২:২৫৬)। বলা হয়েছে, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে ( সূরা-৫:৮০)। বলা হয়েছে, মানুষকে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে ধর্মের কথা বোঝাতে। কুরআন শরিফে বলা হয়েছে, সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান- নিতে (সূরা-৪২: ৩৮)। ইসলাম কোনো স্বৈরশাসনে উৎসাহ জোগায় না। তবে ইসলামে জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে বলা হয়েছে। জিহাদ ইসলামে জায়েজ। কিন' এ ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আক্রমণকারীকে পছন্দ করেন না এবং তোমরা জিহাদে মাত্রা ছাড়িও না (সূরা-২:১৯০)। রাজনীতির ক্ষেত্রে আসে সামাজিক মূল্যবোধের প্রশ্ন। ইসলামে বলা হয়েছে, জনকল্যাণের নীতি (ইসতিসলাহ) অনুসরণ করতে। ইসলামের মধ্যে সম্পৃক্ত রয়েছে কল্যাণব্রতী রাষ্ট্রের ধারণা। ইউসুফ আ:-এর কাহিনীতে আমরা দেখতে পাই যে, মিসরের রাজা (ফেরাউন) তাকে ধর্মগোলার ভার দিয়েছিলেন, যাতে করে দুর্ভিক্ষের সময় ধর্মগোলায় সঞ্চিত খাদ্যশস্য অভাবী মানুষদের মধ্যে ঠিকমতো বণ্টিত হতে পারে। ইসলামি শসনব্যবস'ায় তাই বলা হয় ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’। মানুষ সৎ না হলে কল্যাণব্রতী রাষ্ট্র সাফল্য পেতে পারে না। ইসলামি রাষ্ট্রচিন-ার একটা নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। একে মৌলবাদ বলে চিহ্নিত করতে যাওয়া ভুল। বাংলাদেশে মুসলিম চিন-াবিদেরা মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত হতে পারেন না। কারণ, বাংলাদেশে অনেক ইসলামপন'ী দল আছে। কেবল একটি ইসলামপন'ী দল নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত নয়। বাংলাদেশের ইসলামপন'ীরাও চান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র। চান রাজনৈতিক দল গড়ার স্বাধীনতা। তারা একদলীয় শাসনব্যবস'াকে সমর্থন দিচ্ছেন না। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ইসলামি দল হলো জামায়াতে ইসলামী। এই দল বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলছে। এই দলের ভূতপূর্ব আমির গোলাম আযমকে এখন যুদ্ধাপরাধী বলে বিচার করা হচ্ছে। কিন' তিনি যুদ্ধাপরাধের সাথে কতটা জড়িত ছিলেন, সেটা নিয়ে থাকছে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ। বলা হচ্ছে, তিনি চাননি সাবেক পাকিস-ান ভেঙে যাক। কিন' এই না চাওয়াটা যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে না। যুদ্ধাপরাধের আছে কতগুলো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা। যেমন বন্দীকে হত্যা করা যুদ্ধাপরাধ। গোলাম আযম কোনো বন্দীকে হত্যা করতে বলেছিলেন অথবা হত্যায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এ রকম প্রমাণ উত্থাপন করতে হবে যুদ্ধাপরাধ বিচারের আদালতে। কিন' সেটা কি আসলেই করা হবে? মনে হচ্ছে বিচারের আগেই যেন শাসি- প্রদান হয়ে গেছে। আমার মনে পড়ে, ১৯৪৮-এর কথা। গোলাম আযম সে সময় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছিলেন অকুণ্ঠভাবে। তিনি তখন জামায়াতে ইসলামের সদস্য ছিলেন না। গোলাম আযম জামায়াতে ইসলাম করলেও চেয়েছেন সংসদীয় শাসনব্যবস'া; মুজতাহিদদের ইজমানির্ভর শাসনব্যবস'াকে নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট নই। কিন' বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক জটিলতা আমাকে যথেষ্ট চিনি-ত করে তুলেছে। আমি মনে করি, আমাদের জাতীয় সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞান পথ দেখাতে পারে। কারণ বিজ্ঞান কোনো ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধান অথবা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বিজ্ঞান আবেগনির্ভর নয়। বিজ্ঞান বিশ্লেষণনির্ভর। বিজ্ঞান ও ধর্মবিশ্বাস নিয়ে মুসলিমবিশ্বে যে চিন-ার সমস্যার উদ্ভব হতে পারছে, এক সময় খ্রিষ্টানবিশ্বেও তা হতে পেরেছিল। ব্রিটিশ দার্শনিক স্টুয়ার্ট মিল ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বলেন, উন্নত ধর্মবিশ্বাসের মূল কথা হলো মানুষের জন্য মানুষের সহানুভূতির 
চর্চা। বিজ্ঞানের নামে একে খাটো করে দেখা উচিত হবে না। 
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

শেয়ারবাজার বংলাদেশের মূল পুঁজিবাজার নয়



২০১২-০৩-০৬

শেয়ার বলতে সাধারণভাবে বোঝায় যৌথ মূলধনী কোম্পানির সংগৃহীত মূলধনের একটি ক্ষুদ্র অংশকে। ধরা যাক কোনো যৌথ কোম্পানি ১০ কোটি টাকা পুঁজি হিসেবে সংগ্রহ করতে চাচ্ছে। এর জন্য সে বাজারে এক লাখ শেয়ার ছাড়তে পারে, যার প্রতিটির দাম হতে পারে এক হাজার টাকা। এই শেয়ার ক্রেতারা কিনতে পারে শেয়ারবাজার (স্টক এক্সচেঞ্জ) থেকে। শেয়ারবাজার বলতে সাধারণভাবে বোঝায় এমন জায়গা, যেখানে যৌথ মূলধনী কোম্পানির শেয়ার বা অংশ বেচাকেনা হয়। মানুষ কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনে ওই কোম্পানির কারবারের লাভের অংশ বা ডিভিডেন্ট পাওয়ার জন্য। এর মধ্যে দোষের কিছু থাকে না। কিন' শেয়ারবাজারে শেয়ার কেনাবেচা এমন একটা পৃথক ব্যবস'া হয়ে দাঁড়ায়, যাতে যুক্ত হতে পারে অনেক অনিয়ম আর সেই সাথে দুর্নীতি। শেয়ার কেনাবেচার দালাল (অ্যাজেন্ট) বলতে বোঝায় তাদের, যারা হলেন শেয়ারবাজারের সদস্য, যাদের থাকে শেয়ারবাজারে বৈধভাবে শেয়ার কেনাবেচার অধিকার। শেয়ারবাজারে কেবল সেসব কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হতে পারে, যাদের শেয়ারবাজারের পরিচালকমণ্ডলী দান করেন অনুমোদন। অননুমোদিত কোনো কোম্পানির শেয়ার কোনো বিশেষ শেয়ারবাজারে বিক্রি হতে পারে না। শেয়ারবাজারের পরিচালকেরা কোনো কোম্পানি সম্পর্কে বিশেষভাবে নিশ্চিত না হলে কোনো শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ার বিক্রির অনুমোদন দেয় না। শেয়ারবাজারের দালাল হতে হলে শেয়ারবাজারের সদস্য হতে হয়। কেবল শেয়ারবাজারের সদস্যরাই পারেন শেয়ার কেনাবেচা করতে। শেয়ারবাজারের সভ্য (দালাল) ছাড়া আর কেউ শেয়ারবাজারে প্রবেশের অধিকারী নন। তবে শেয়ারবাজারের কাছে শেয়ারবাজারের দালালদের অফিস থাকে, যেখানে যেয়ে সহজেই তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায় এবং তাদের মাধ্যমে করা সম্ভব হয় শেয়ার কেনাবেচা। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে প্রবেশ করবার জন্য ৬ মাসমেয়াদি টিকিট কেনা চলে। এভাবে টিকিট কিনেও শেয়ারবাজারের দালালদের সাথে যোগাযোগ করে শেয়ার কেনাবেচা সম্ভব। শেয়ার কেনাবেচা শেষ পর্যন- দাঁড়ায় ফটকাবাজারিতে। ফটকাবাজারি বলতে বোঝায় শেয়ার কেনাবেচা করে লাভবান হওয়ার চেষ্টাকে। শেয়ারবাজার শেষ পর্যন- হয়ে দাঁড়ায় একটা ফটকাবাজারের কেন্দ্র। ফটকা দুই রকমের হতে পারে। এক রকম ফটকা হলো, কম দামে শেয়ার কিনে সেই শেয়ারের দাম বাড়লে বিক্রি করে লাভ করা। আর এক রকম ফটকা হলো, কোনো কোম্পনির শেয়ার পরে কম দামে কেনা যাবে এ কথা ভেবে আগে বিক্রি করা। এ ক্ষেত্রে শেয়ার বিক্রি না করে বাজি ধরা হয়। যদি কোনো কোম্পানির শেয়ার পরে কম দামে বিক্রি না হয়, তবে যে শেয়ার না কিনে আগাম বিক্রি করে তাকে বিপাকে পড়তে হয়। কম দামে শেয়ার কিনে পরে ওই শেয়ারের দাম বাড়লে তা বিক্রি করে যারা লাভবান হতে চান তাদের বলে তেজিওয়ালা। ইংরেজিতে বলে বুল (Bull)। আর যারা ভবিষ্যতে কোনো কোম্পানির শেয়ার কম দামে বিক্রি হবে এটা ভেবে আগাম বিক্রি করে তাদের বলা হয় মন্দিওয়ালা। মন্দিওয়ালাদের ইংরেজিতে বলে বেয়ার (Bear)। শেয়ারবাজার হয়ে দাঁড়ায় তেজিওয়ালা ও মন্দিওয়ালাদের লীলাক্ষেত্রে। শেয়ারবাজারে কেনাবেচা করে খুব বেশি লোক লাভবান হতে পারেন না। শেয়ারবাজার হয়ে দাঁড়ায় কতকটা জুয়া খেলার মতো। জুয়া খেলার মতোই হলো শেয়ারবাজারের শেয়ার কেনাবেচার আকর্ষণ। আমি কখনোই শেয়ার কেনাবেচা করিনি। আমার এক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ইংরেজ আমলে কলকাতা শেয়ারবাজারে কেনাবেচা করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমি থেকেছি শেয়ারবাজার থেকে দূরে। শেয়ারবাজার আমার কাছে মনে হয়েছে একটা ভয়ঙ্কর অনিশ্চিত স'ান। হঠাৎ বড়লোক হওয়ার চিন-া আমার ছিল না। আর এখনো নেই। অনেকে শেয়ারবাজারে ফটকাবাজারি করেন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। শেয়ারবাজারে ধস নামলে শোধ হতে পারে না ব্যাংকঋণ। অনেক ব্যাংক ফেল পড়ে এ রকম ঋণ দেয়ার কারণে। বিশেষ করে ছোট ব্যাংকগুলো। তবে বড় ব্যাংকও ফেল পড়তে পারে। আর দেশে দেখা দিতে পারে অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়। ১৯২৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ রকম বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্টি হয়েছিল মহামন্দা। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবার দেখা দিয়েছে মহামন্দা না হলেও বড় রকমের মন্দা, যার একটা কারণ হলো ব্যাংক কর্তৃক বিষাক্ত ঋণ প্রদান। বিষাক্ত ঋণ বলতে বোঝায়, যে ঋণ শোধ হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি তৈরির কোম্পানি বাজারে অনেক শেয়ার ছাড়ে। এসব শেয়ার বিক্রি হয় প্রচুর। বাড়ি তৈরির কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি বাড়ি তৈরি করে ফেলে। বাড়ি বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরির কোম্পানির শেয়ার যারা কিনেছিলেন তাদের পক্ষে ব্যাংক ঋণ শোধ দেয়া সম্ভব হয় না। এটা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান মন্দা সৃষ্টি হওয়ার একটা কারণ। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর ইউরোপের অর্থনীতি বিশেষভাবে নির্ভরশীল, তাই সেখানেও এসে পড়েছে বড় রকমের মন্দার প্রভাব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত সাপ্তাহিক টাইম পত্রিকার ২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ সংখ্যায় একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজার হলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই ঝুঁকির মাত্রা কমার কোনো লক্ষণ আপাতত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কারণ, বিশ্বজুড়ে চলছে বাণিজ্যমন্দা। নিকট ভবিষ্যতে যার মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। এর এর ফলে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কমতে পারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের চাহিদা। এই চাহিদা কমে যাওয়া বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে করে তুলতে পারে আরো অনেক বেশি অনিশ্চিত। শেয়ারবাজার নিয়ে অনেক দেশেই উঠছে প্রশ্ন। শেয়ারবাজারকে কি আসলেই বলা যায় পুঁজির বাজার? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজার অবসি'ত নিউ ইয়র্ক শহরের ওয়াল স্ট্রিটে। একদল মার্কিন নাগরিক এখন চাচ্ছেন এই শেয়ারবাজারের বিলুপ্তি। তারা বলছেন, ওয়াল স্ট্রিট দখল করো। তারা চাচ্ছেন ফটকাবাজারি অর্থনীতির অবসান। আমি শেয়ার কেনাবেচার বিরোধী নই। কিন' একে নির্ভর করে যে ভয়ঙ্কর ফটকাবাজারি সৃষ্টি হতে পারে, আমি তার ঘোর বিরোধী। বাংলাদেশে আগে শেয়ারবাজার ছিল না। এখন হয়েছে। কিন' এই শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে ক্ষতিকর ফটকাবাজারি।
আমাদের দেশ এখনো মূলত কৃষিনির্ভর। আমাদের দেশের অর্থনীতি এখনো হয়ে আছে বস'ত কৃষি অর্থনীতি। আমাদের দেশের শেয়ারবাজারকে পুঁজির বাজার হিসেবে যে রকম গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে আসলে তার সে রকম গুরুত্ব নেই। কারণ শেয়ারবাজারের টাকা এসে মূলধন হিসেবে খাটতে পারছে না আমাদের কৃষি অর্থনীতিতে। আমার মনে হয় এ দেশের কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত সমবায় সমিতিভিত্তিক কৃষি ব্যাংক। কৃষিতে উন্নতি ঘটলে বাড়বে কৃষিজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। আর তাই আমরা নানা জিনিস উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারব তাদের কাছে। অর্থাৎ ঘটতে পারবে আমাদের অভ্যন-রীণ বাজারের বিশেষ সম্প্রসারণ, যেটা পাওয়া উচিত আমাদের অগ্রাধিকার। শেষ পর্যন- খেয়ে-পরে বাঁচতে হয় মানুষকে। আর এই খেয়ে-পরে বাঁচা নির্ভর করে একটা দেশের মাটির ওপর।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিষ্ট

সমুদ্র আইন



২০১২-০৩-২৬

আন-র্জাতিক আইনের জনক হিউগো গ্রোশিয়াস (১৫৮৩-১৬৪৫)। জন্মেছিলেন হল্যান্ডে। তিনিই প্রথম সমুদ্র সম্পর্কে আইন করার প্রস্তাব রাখেন। গ্রোশিয়াস মনে করতেন, মানুষের আইন হতে হবে প্রাকৃতিক নিয়মের সাথে সঙ্গতি রেখে। মানুষ বাস করে স'লে। মানুষ জলচর প্রাণী নয়। সমুদ্র তাই কোনো বিশেষ জাতির অধিকারের ব্যাপার হতে পারে না। সমুদ্রে থাকতে হবে সব জাতির জাহাজ চলাচলের সমান অধিকার। কিন' একটা দেশের কাছে অবসি'ত সমুদ্রে কিছু দূর পর্যন- থাকা উচিত সে দেশের কর্তৃত্ব। কারণ তা না থাকলে সমুদ্রতীরবর্তী দেশটির নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে। প্রত্যকটি জাতি চায় তার নিরাপত্তা। এই নিরাপত্তা চাওয়া হলো মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতি। যেকোনো আইনে তাই একে নিতে হবে বিশষ বিবেচনায়। গ্রোশিয়াসের এই প্রাকৃতিক নিয়মের ধারণা নিয়ে সূত্রপাত ঘটে সমুদ্র আইনের। ঠিক হয় একটা সমুদ্রতীরবর্তী দেশ, সেই দেশ থেকে কামানের গোলা ছুড়লে তা যত দূর যেয়ে পড়বে, সেই দূরত্বের মধ্যে সমুদ সীমানা হবে তার নিজের। সেখানে থাকবে তার কর্তৃত্ব। সে সময় কামানের গোলা খুব বেশি দূর যেত না। সাধারণত কামানের পাল্লা ছিল পাঁচ কিলোমিটারের মতো। কিন' ক্রমেই কামানের পাল্লা বাড়তে থাকে। আর সমুদ্র আইনে দেখা দেয় জটিলত। এখন একটা দেশের সমুদ্র নিয়ে হয়েছে অনেক সুস্পষ্ট আইন। আইন না বলে একে আসলে বলা উচিত কনভেনশন বা প্রথা। গঠিত হয়েছে বিশেষ আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনাল : International Tribunal for the Law of the Sea, সংক্ষেপে (ITLOS)। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ই এই ট্রাইব্যুনালের আওতাভুক্ত। এই দুই দেশই মেনে নিয়েছে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের অধিকার। 

বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দেয়ার জন্য এই ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছিল মিয়ানমারের বিপক্ষে ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবরে। মামলার রায় এখন পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের বিরোধ ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র এলাকা নিয়ে। আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার। আর মিয়ানমার পেয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৮৩২ বর্গকিলোমিটার। আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালের এই রায় মিয়ানমার ও বাংলাদেশ মেনে নিয়েছে। এই রায়ে এই দুই দেশের কেউ-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হারজিত হয়নি কারো। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক কারণে বলছে, এই রায়ে বাংলাদেশ জিতেছে। কিন' বাস-বে তা হয়নি।

সমুদ্রতীরবর্তী একটা দেশের ভূমির কিছুটা অংশ থাকে সমুদ্রের পানির মধ্যে। এখানে সমুদ্রের গভীরতা সাধারণত থাকে ১৮০ মিটারের কাছাকাছি। সমুদ্রের পানির মধ্যে একটা দেশের ডুবে থাকা এই অংশকে বলে মহীসোপান (Continental Shelf)। মহীসোপান ঢালুভাবে নেমে যায় সমুদ্রের মধ্যে। এই ঢালু জায়গাকে বলা হয় মহীঢাল (Continental Slope)। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে দু’ভাবে। মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে সমদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়। বিশেষ করে ঝড়ের সময় সমুদ্রের ঢেউ ডাঙার যে অংশে এসে আছড়ে পড়ে সেই অংশে। কারণ, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ডাঙার এই অংশ ক্ষয় হয়। এখানে এসে জমতে পারে সমুদ্রের পানি অগভীরভাবে। আবার মহীসোপান সৃষ্টি হতে পারে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে জমে। আমাদের দেশে সমুদ্র উপকূলে মহীসোপান প্রসে' বেড়ে চলেছে। এটা হতে পারছে নদীবাহিত পলিমাটি সমুদ্রে এসে জমার ফলে। পলিমাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছে সমুদ্র। ফলে বাড়ছে বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ। বাংলাদেশ সমুদ্রের যে অংশ পেল, নদীবাহিত পলিমাটি জমে সমুদ্র ভরাট হয়ে একদিন সেখানে জেগে উঠবে মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি। সেটা হবে বাংলাদেশেরই অংশ। আপাতত সমুদ্রের যে এলাকা আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশ পেতে পারল, সেখানে বাংলাদেশের জেলেরা যেয়ে অবাধে মাছ ধরতে পারবে, যা অনেক পরিমাণে পূরণ করবে বাংলাদেশের মৎস্যের চাহিদা। সমুদ্রের পানির নিচে এখন যে অংশ আছে, সেখানে পাওয়া যেতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল, যা উঠাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি হতে পারবে যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

ভারতের সাথেও সমুদ্রসীমা নিয়ে আমাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিরোধ মীমাংসার জন্য বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে পারেনি। কারণ ভারত চায়নি এই ট্রাইব্যুনালে যেতে। বাংলাদেশ ভারতের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হেগে ‘পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন’ বা আন্তর্জাতিক সালিস আদালতে। এই আদালত যে রায় দেবে ভারত তা না-ও মানতে পারে। কারণ কোনো দেশ এই আদালতের সালিস মানতে সেভাবে বাধ্য নয়। বাংলাদেশ তাই আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তার সমুদ্রের ওপর অধিকার যেভাবে পেতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক সালিস আদালতে তা পেতে পারবে কি না সেটা নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ আন-র্জাতিক সালিস আদালতে যেয়ে ভুল কাজ করেনি। কারণ তার নৌবহর এমন শক্তিশালী নয় যে, সে সামরিক শক্তিবলে ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আমাদের তাই নির্ভর করতে হবে আন-র্জাতিক সালিস আদালতেরই ওপর।

মিয়ানমার ও ভারতের ইতিহাস ভিন্ন। মিয়ানমার বা বার্মা একসময় ছিল ব্রিটিশ-ভারত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ। যেমন প্রদেশ ছিল বাংলা। মিয়ানমার ছিল ব্রিটিশ-ভারতের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। কিন' মিয়ানমার ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়। থাকে না আর ব্রিটিশ-ভারতের একটি প্রদেশ হয়ে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মিয়ানমার ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ-ভারত থেকে হতে পেরেছিল পৃথক। যদি সে এভাবে পৃথক হতে না পারত তবে ভারত হয়তো এখন দাবি করত মিয়ানমারকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। যেমন সে দাবি করছে উত্তর-পূর্ব ভারতকে। 

মিয়ানমারের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমান- রয়েছে। কিন' বাংলাদেশকে যেমন ভারত তিন দিক থেকে ঘিরে আছে, মিয়ানমার সেভাবে ঘিরে নেই। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বিরোধ নেই। কিন' ভারতের সাথে বাংলাদেশের আছে ঐতিহাসিক বিরোধ। মিয়ানমারের ভৌগোলিক আয়তন বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের চার গুণের বেশি। কিন' মিয়ানমার তা বলে চাচ্ছে না বাংলাদেশকে দখল করে তাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন' ভারত স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের ওপর তার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার। তাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেকোনো বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে উঠছে কঠিন। ভারতের সাথে সমুদ্র সীমানার মীমাংসা হওয়াও তাই যে সহজ হবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। সেখানেও দু’টি দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ বাধার সৃষ্টি করতে পারে। 

মিয়ানমারের যে প্রদেশকে আমরা বলি আরাকান, আর মিয়ানমার এখন বলে রাখাইন, তার সাথে আমাদের আছে সাধারণ সীমান-। কিন' এই সীমান- নিয়ে এখন আর কোনো বিরোধ নেই। এটা নিষ্পত্তি হতে পেরেছে পাকিস-ান আমলে। আরাকানি মুসলমানদের সাধারণভাবে বলা হয় রোহিঙ্গা। সাধারণ বৌদ্ধ আরাকানি আর রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ বিরোধ। এই বিরোধের ফলে ১৯৯১ সালে আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস', যাদের অনেকে এখনো আরাকানে ফিরে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে এদের যাপন করতে হচ্ছে খুবই করুণ জীবন। তবে বার্মার সাথে এ নিয়ে বাংলাদেশ জড়াতে চাচ্ছে না বিবাদে। ইংরেজ শাসনামলে চট্টগ্রামের দোহাজারী রেলস্টেশন থেকে আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ স'াপনের একটা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন' এই পরিকল্পনা বাস-বায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপান মিয়ানমারকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে। আরাকানসহ সমস- মিয়ানমার ১৯৪২ সালে চলে যায় জাপানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৫ সাল পর্যন- মিয়ানমার থেকেছে জাপানের নিয়ন্ত্রণে। এরপর বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কিন' এখন চেষ্টা চলেছে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে রেল যোগাযোগের। এ রকম রেল যোগাযোগ স'াপিত হলে বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে ভৌগোলিক কারণে বাড়বে ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিমাণ। আরাকানের সাথে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। আরাকানের সাথে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এখনো সহজ হতে পারেনি। বাংলাদেশের সাথে আরাকানের রেল যোগাযোগ হলে আরাকানে ব্যবসায়-বাণিজ্য তাই বাংলাদেশের সাথে বেড়ে যেতেই চাইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্য সৃষ্টি করবে উভয়ের মধ্যে মৈত্রীর বিশেষ পরিবেশ। ভারত সম্ভবত চাচ্ছে না এ রকম মৈত্রীর বন্ধন গড়ে ওঠা। 

তাই বাংলাদেশে ভারতঘেঁষা পত্রপত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছিল, মিয়ানমার মানতে ইচ্ছুক নয় আন-র্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়। মিয়ানমার সৈন্যসমাবেশ করছে আরাকান-বাংলাদেশ সীমান্তে। কিন' আরাকানে এ রকম সৈন্যসমাবেশ মিয়ানমার ঘটায়নি। এটা ছিল মিথ্যা প্রচারণা। আমরা মিয়ানমারের সাথে কোনো সঙ্ঘাত চাই না। আমরা কোনো সঙ্ঘাত চাই না ভারতেরও সাথে। তাই আমরা মামলা করেছি আন্তর্জাতিক সালিস আদালতে। আইনের মাধ্যমে আমরা চাচ্ছি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে আসতে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন আসলে কোনো আইন কি না তা নিয়ে আছে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ বিতর্ক। কারণ আন-র্জাতিক আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারী দেশকে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে এখনো কোনো শাসি- প্রয়োগের ব্যবস'া করা সম্ভব হয়নি। আইনের পক্ষে শক্তির সমর্থন না থাকলে আইনের বাস-ব প্রয়োগ দুর্বল হতে বাধ্য। সমুদ্র আইন আছে, কিন' সমুদ্র আইন ভঙ্গ করলে আইন ভঙ্গকারীকে শাসি- প্রদানের কোনো ব্যবস'া এখনো নেই। 
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

সোমবার, ১৯ মার্চ, ২০১২

ইতিহাস বিকৃতি প্রসঙ্গে


পত্রিকার খবর পড়ে জানলাম, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা হয়েছে ইতিহাস বিকৃতির। তাই বিষয়টি নিয়ে আমাদের মতো অনেকের মনে জাগছে অনেক প্রশ্ন। সব দেশেই ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। তাদের ইতিহাস গবেষণা ও চর্চার ক্ষেত্রে থাকা উচিত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতাকে ধরা উচিত গণতন্ত্রের অংশ। বাংলাদেশ যদি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে থাকে তবে এই গণতান্ত্রিক অধিকারে হস-ক্ষেপ করতে যাওয়া সমীচীন বলে বিবেচনা পেতে পারে না। একটা দেশের আদালত খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন' সর্বক্ষেত্রে আদালতকে টেনে আনলে তা সৃষ্টি করতে পারে প্রভূত সমস্যা। সেটা একটা জাতির জীবনে বাঞ্ছিত হতে পারে না।
কয়েক বছর আগের ঘটনা, ভারতে কলকাতা হাইকোর্টে কলকাতার ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে একটি মামলা হয়েছিল। কলকাতা হাইকোর্ট এর জন্য কয়েকজন খ্যাতনামা ঐতিহাসিককে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেন। এবং তাদের কাছে জানতে চান কলকাতা শহরের ইতিহাস। এসব ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা বলেন, জব চার্নব কলকাতায় কুঠিবাড়ি স'াপনের আগেই সেখানে ছিল হাটবাজার ও বর্ধিষ্ণু জনপদ। এখানে বাস করত অনেক আর্মানি খ্রিষ্টান ব্যবসায়ী। জব চার্নব তাই কলকাতাকে বেছে নিয়েছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স'াপনের জন্য। আর্মানি খ্রিষ্টান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পেয়েছিল যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় কুঠি স'াপন না করলেও এখানে গড়ে উঠতে পারত বিশেষ ব্যবসায় কেন্দ্র। তাই বলা চলে না, জব চার্নব কলকাতা শহরের জনক। যদিও কলকাতা শহর গড়ে ওঠার পেছনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবদান খুবই বিদিত। ইংরেজরা ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে চেয়েছিল তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স'াপন করতে। কিন' নৌযুদ্ধে ইংরেজরা পর্তুগিজদের সাথে সে সময় এঁটে উঠতে পারেনি। চট্টগ্রাম থেকে যায় পর্তুগিজদের অনুকূলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় কুঠি স'াপন করে ১৬৯০ সালের কাছাকাছি। কলকাতা হাইকোর্ট তাই রায় দেন, কলকাতা শহরের জন্মদিন হিসেবে কোনো বিশেষ দিবস পালন করা যাবে না। তাদের এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা ওঠেনি। কারণ আদালত বিশিষ্ট ঐতিহাসিককে নির্ভর করে প্রদান করেন তাদের রায়।
আমাদের দেশে ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে হাইকোর্টে অভিযোগ উঠেছে। আমাদের হাইকোর্ট কিভাবে এর বিচার করবেন সেটা আমরা বলে দিতে পারি না। তবে মনে হয় কলকাতা হাইকোর্টের বিচার এ ক্ষেত্রে কিছুটা নজির হতে পারে। আমাদের অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির যেই অভিযোগ উঠেছে সেটা তাদের ইচ্ছাকৃত না প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব সেটা বিচার্য হতে হবে। তারা যা বলেছেন, সেটা তাদের জ্ঞানের অভাবজনিত কারণে ঘটে থাকতে পারে। আসলে ১৯৭১ সালে প্রকৃতই কী ঘটেছিল সে সম্বন্ধে আমরা চেষ্টা করেও তথ্য সংগ্রহ করতে যে পারছি তা নয়। যেসব তথ্য পাচ্ছি তাদের সমন্বয়ে ইতিহাসের একটা সমন্বিত চিত্র এখনো পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক তথ্যই মনে হচ্ছে পরস্পরবিরোধী। যেমন ভারতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬ নভেম্বর ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্ক শহরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতায় তিনি বলেন, তিনি যত দূর জানেন, শেখ মুজিব নিজে এখন পর্যন- বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোনো ঘোষণা প্রদান করেননি। শেখ মুজিবকে মুক্ত করে তার সাথে আলোচনার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শানি-পূর্ণ সমাধান তাই এখনো অসম্ভব নয়। বলা হচ্ছে, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষক। যারা এর বিপক্ষে কিছু বলবেন, ধরতে হবে তারা ইতিহাস বিকৃত করছেন। কিন' ইন্দিরা গান্ধী সত্য হলে বলতে হবে তাদের বক্তব্য ইতিহাস বিকৃতির নিদর্শন নয়। ইন্দিরা গান্ধী সে সময়ের ঘটনা সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন। এই বক্তৃতায় ইন্দিরা গান্ধী আরো বলেন, শেখ মুজিব মার্কিনবিরোধী নন। তাই শেখ মুজিবের সাথে সহযোগিতা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারে। ইন্দিরা গান্ধীর এই বক্তৃতাটি সঙ্কলিত হয়েছে ÔIndia Speaks’ নামক বইয়ে। বইটি সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ভারতের প্রচার দফতর থেকে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে।
শেখ মুজিব ব্যক্তিগতভাবে কী চেয়েছিলেন সেটা অনুমান করা যথেষ্ট কঠিন। শেখ মুজিব পাকিস-ান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনে যান। পাকিস-ান থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি সরাসরি বাংলাদেশে আসেননি। তিনি কেন লন্ডনে গিয়েছিলেন সেটা যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। লন্ডনে তিনি বিলাতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী হিথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি কেন এই সাক্ষাৎকারকে প্রয়োজনীয় মনে করেছিলেন আমরা তা জানি না। সাংবাদিক অ্যানথোনি ম্যাসকারেনহ্যাস তার বহুল পঠিত Bangladesh, A Legacy of Blood বইয়ে বলেছেন- শেখ মুজিব তাকে লন্ডনে বলেন, তিনি (শেখ মুজিব) পাকিস-ানের সাথে সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছেন না। তিনি পাকিস-ানের সাথে বিশেষ ধরনের সম্পর্ক (Some link) রাখার পক্ষে। এই বিশেষ ধরনের সম্পর্ক কী হবে সেটা তিনি ঠিক করবেন বাংলাদেশে যাওয়ার পর। তিনি এই বিষয়ে আলোচনা করবেন তার দলের আর সব নেতার সাথে। তারপর তিনি এই বিষয়ে গ্রহণ করবেন সিদ্ধান-। ম্যাসকারেনহ্যাস সত্যি হলে বলতে হবে শেখ মুজিব চাননি পাকিস-ানের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে। বরং চেয়েছিলেন, পাকিস-ানের সাথে একটা বিশেষ রকমের সম্পর্ক বজায় রাখতে। কিন' এখন বলা হচ্ছে, পাকিস-ানের সাথে শেখ মুজিব চেয়েছিলেন সব সম্পর্কের বিচ্ছেদ। মার্কিন পত্রপত্রিকায় এ সময় খবর বেরিয়েছিল যে, বাংলাদেশ চাচ্ছে পাকিস্তানের সাথে একটা বিশেষ সম্পর্ক বজায় রাখতে। শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর তার সাথে নানা বিষয়ে তাজউদ্দীনের গুরুতর মতপার্থক্য হতে দেখা যায়। তাজউদ্দীনের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি (তাজউদ্দীন) হলেন ভারতের চর। তিনি ভারতের সাথে এমন সব গোপন চুক্তি করেছেন, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন'ী। শেখ মুজিব তাজউদ্দীনকে বাদ দেন তার মন্ত্রিসভা থেকে। তাজউদ্দীন ভারতে গিয়ে গড়েছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। এতে শেখ মুজিবের কত দূর সম্মতি ছিল তা বলা যায় না। তাই বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হয়ে আছে যথেষ্ট কষ্টসাপেক্ষ। এ বিষয়ে ইতিহাস লিখতে গিয়ে অনেকেই করতে পারেন ভুল। কিন' এই ভুলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। ধরতে হয়, না জানার কারণেই এই ভুল ঘটতে পারছে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান মোশতাকের পর ক্ষমতায় আসেন। জিয়াউর রহমান যখন দিল্লি সফরে যান তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোরারজি দেশাই। ভারতের প্রেসিডেন্ট ছিলেন নিলম সঞ্জীব রেড্ডি। ভারতের প্রেসিডেন্ট রেড্ডি দিল্লি বিমানবন্দরে জিয়াউর রহমানকে স্বাগত জানান। তিনি তার স্বাগত ভাষণে জিয়াউর রহমানকে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশর স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। ভারতের প্রেসিডেন্টের এই উক্তিকে সত্যি বলে ধরলে জিয়াকে বলতে হয় স্বাধীনতার ঘোষক। আমাদের কোনো ঐতিহাসিক যদি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলতে চান, তাকে বলা যাবে না অপরাধী। কারণ ভারতের প্রেসিডেন্ট একজন খুবই নির্ভরজনক ব্যক্তি। অবশ্য তার বক্তব্যেও ভুল থাকা সম্ভব। ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে আমাদের অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার বিচার করতে হলে ইন্দিরা গান্ধীর এবং ভারতের প্রেসিডেন্টের দেয়া ভাষণকে বিবেচনায় নিতে হবে। আদালত কী রায় দেবেন আমরা সে বিষয়ে কোনো অনুমান করতে চাই না। কিন' বাইরে রাজপথে অনেক কিছুই ঘটছে।
আমরা ১২ মার্চ দেখলাম খলেদা জিয়ার ডাকে বিপুল জনসমাগম ঘটতে। বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই সরকার নিঃসন্দেহে জিয়াকে আবার ঘোষণা করবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তখন আর বজায় থাকবে না। এটা সহজেই অনুমান করা চলে। ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে যে মামলা উঠেছে সেটা না ওঠা ছিল ভালো। এতে দেশবাসীর মনে সৃষ্টি হতে পারছে নানা বিভ্রান্তি।
এই লেখাটি শেষ হওয়ার পর জানতে পারলাম অধ্যাপকদের বিপক্ষে যে মামলাটি করা হয়েছিল সেটি খারিজ করে দেয়া হয়েছে। খবরটি জেনে খুব খুশি হলাম। একসময় আমিও অধ্যাপক ছিলাম আর তাই অধ্যাপকদের এভাবে বিচার করা আমার কাছে মনে হচ্ছিল খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। সর্বোপরি এসব অধ্যাপক এমন কিছু লেখেননি যা ইতিহাসের খুবই বরখেলাপ। আমি আমার লেখায় যা প্রমাণ করতে চেয়েছি, তাই হয়তো এই লেখাটির এখনো কিছু মূল্য আছে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১২

বাংলাদেশে হিন্দিপ্রীতি

॥ এবনে গোলাম সামাদ ॥ ভাষা মানুষের জীবনে একটা বিরাট বাস-বতা। মানুষ ভাষার মাধ্যমে মনোভাব ব্যক্ত করে। ভাষার মাধ্যমে চিন-া করে। ভাষার মাধ্যমে ধরে রাখতে চায় তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে। ভাষা আধুনিক জাতীয়তাবাদের অন্যতম উপাদান; যদিও একমাত্র উপাদান নয়। জাতিসত্তার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় ভাষাকে কেন্দ্র করে। রাশিয়ানরা রুশ ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছিল হাঙ্গেরিতে; কিন' হাঙ্গেরিয়ানরা এটা মেনে নিতে চায়নি। হাঙ্গেরিয়ায় রুশবিরোধী অভ্যুত্থানের এটা ছিল একটা কারণ। বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছে, উর্দু ভাষার আধিপত্য মেনে নিতে চায়নি বলে। ব্যাকরণগত দিক থেকে হিন্দি আর উর্দুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। হিন্দি ও উর্দুর মধ্যে একটা পার্থক্য হলো, উর্দু ভাষায় থাকতে দেখা যায় ফারসি ও আরবি শব্দের প্রাধান্য। অন্য দিকে হিন্দি ভাষায় থাকতে দেখা যায় সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্য। এ ছাড়া হিন্দি ভাষা লেখা হয় দেব নাগরি অক্ষরে। অন্য দিকে উর্দু লেখা হয় আরবি-ফারসি অক্ষরে। হিন্দি প্রধানত বলে উত্তর ভারতের গ্রামের লোকে; কিন' উর্দু বলে শহরের বাসিন্দারা। এ দিক থেকে উর্দুকে বলতে হয় শহুরে ভাষা। হিন্দি এখনো শহুরে ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। হিন্দি খুব গ্রহণপটু ভাষা নয়। অর্থাৎ হিন্দি চায় না বিদেশী শব্দকে সহজে গ্রহণ করতে। পক্ষান-রে উর্দু অনেক গ্রহণপটু ভাষা। ইংরেজি ভাষা থেকে উর্দু অনেক শব্দ গ্রহণ করেছে এবং এখনো করছে। এ দিক থেকে উর্দু হলো অনেক সমৃদ্ধ ভাষা। অনেক ভাষাতাত্ত্বিকের মতে উর্দু সাহিত্য হিন্দি সাহিত্য থেকে আছে এগিয়ে।
ব্রিটিশ শাসনামলে সেনাবাহিনীতে চলত রোমান উর্দু। রোমান উর্দু বলতে বোঝাত রোমক বর্ণমালায় লিখিত উর্দুকে। উর্দুর বিশেষ বিকাশ ঘটতে পেরেছে ব্রিটিশ শাসনামলে। উর্দু এখন পাকিস-ানের রাষ্ট্রভাষা। কিন' এখনো উর্দু পাকিস-ানের কোনো প্রদেশের মানুষের মাতৃভাষা হয়ে ওঠেনি। উর্দু এখনো বলতে গেলে হয়ে আছে উত্তর ভারতের বিস-ীর্ণ অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা। ভারতের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিং গর্ব করে বলেছিলেন, উর্দু তার মাতৃভাষা। জওয়াহের লাল নেহরু ঠিক হিন্দি বলতে পারতেন না। বক্তৃতা দিতেন আসলে উর্দু ভাষাতেই। উর্দু ভাষার প্রাণকেন্দ্র হলো ভারতের উত্তর প্রদেশ। ভারতের উর্দুভাষী অঞ্চল থেকে যারা গেছেন পাকিস-ানে, তাদের সাথে ঠিক বনিবনা হচ্ছে না স'ানীয় বাসিন্দাদের। উর্দু করাচি শহরে চলে, কিন' সিন্ধু প্রদেশে নয়। ভারতে ভাষা এখনো হয়ে আছে একটা বড় রকমের সমস্যা। দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় ভাষা পরিবারভুক্ত ভাষায় যারা কথা বলেন তারা মানতে চাচ্ছেন না হিন্দির দৌরাত্ম্য। ফলে এখনো করা সম্ভব হয়নি হিন্দিকে বাস-বে রাষ্ট্রভাষা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ-কারবার এখনো চলেছে ইংরেজি ভাষারই মাধ্যমে। তামিলনাড়ুতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার হিন্দি ভাষায় কোনো চিঠি লিখলে তার সাথে দিতে হচ্ছে ইংরেজি অনুবাদ। এ হলো আজকের ভারতের ভাষা সমস্যার ক্ষেত্রে এক বিশেষ বাস-বতা।
কথাগুলো বলতে হচ্ছে এই কারণে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সমপ্রতি বলেছেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত করার লক্ষ্যে আমাদের হিন্দি ভাষা শেখা উচিত (নয়া দিগন-, ২৩ জানুয়ারি ২০১২)। কিন' তিনি বলেননি হিন্দি শেখার মাধ্যমে ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নত হবে কিভাবে। কারণ বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ। পশ্চিমবঙ্গের ভাষা হলো বাংলা। হিন্দি শিখে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের উত্তর-পূর্বে রয়েছে ভারতের যে সাতটি প্রদেশ, তাদের কারো প্রাদেশিক সরকারি ভাষা হিন্দি নয়। হিন্দি ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে এসব প্রদেশের মানুষের মনে সৃষ্টি হতে পেরেছে প্রবল ক্ষোভ। হিন্দি ভাষা শিখে আমরা তাই এদের সাথে উন্নত সম্পর্ক সৃষ্টির কথা ভাবতে পারি না। তাদের সাথে উন্নত সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হলে আমাদের শিখতে হবে এসব অঞ্চলের মানুষের ভাষা। বিশেষ করে আসামের অহমিয়া, মেঘালয়ের খাসিয়া ও মিজোরামের মিজো ভাষা। কারণ এদের সাথে আছে আমাদের সাধারণ সীমান-। আমরা তাই বুঝতে সক্ষম হচ্ছি না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কী করে বলতে পারছেন হিন্দি ভাষা শিখে ভারতের সাথে উন্নত সম্পর্ক সৃষ্টির কথা। বাংলা যত লোকের মাতৃভাষা, তাদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগের বাস বাংলাদেশে। আর শতকরা ৪০ ভাগের বাস হলো ভারতে। কিন' পশ্চিম বাংলার বাইরে ভারতের বাংলাভাষী মানুষ এখন বাংলা ভাষায় কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ তাদের বিবেচনা করা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আগত অবাঞ্ছিত মানুষ হিসেবে। এভাবে বাংলাভাষী মানুষকে অবাঞ্ছিত ভাবলে বাংলাদেশের মানুষের সাথে ভারতের সম্পর্ক কখনওই উন্নত হতে পারবে না। বাংলা ভাষা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে ভারত সরকারকেও। বাংলা ভাষাকে দিতে হবে বিশেষ মর্যাদা। কিন' ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন বলে আমাদের মনে হচ্ছে না।
ভারতের ২৮টি প্রদেশের মধ্যে ৯টির প্রাদেশিক সরকারি ভাষা হলো হিন্দি। এই প্রদেশগুলো হলো- বিহার, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাচল ও রাজস'ান। এদের কারো সাথে বাংলাদেশের কোনো সীমান- নেই। পশ্চিমবঙ্গের সীমান- আছে বিহার ও ঝাড়খন্ডের সাথে; কিন' আমাদের এদের সাথে কোনো সীমান- নেই। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বিহারের পুর্নিয়া জেলায় অনেক লোক বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ঝাড়খন্ডেও রয়েছে অনেক বাংলাভাষাভাষী মানুষ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলোর মধ্যে আসামের গোয়ালপাড়া ও কাছার জেলার মানুষ কথা বলেন বাংলা ভাষায়। ত্রিপুরা রাজ্যে এক সময় চলত টিপরা ভাষা। কিন' এখন সেখানকার ভাষা বিশেষভাবেই হয়ে উঠেছে বাংলা। বাংলা ভাষার স'ান পৃথিবীর মূল ভাষাগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে সপ্তম কি অষ্টম। ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা যথেষ্ট উন্নত। বিশেষ করে হিন্দি ভাষার তুলনায়। তাই হিন্দি চর্চা করে ভারতের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করা বৃথা। হিন্দির চেয়ে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই আমরা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের সাথে প্রয়োজনে অনেক সহজে যোগাযোগ স'াপন করতে পারি। ভারত ঠিক এক জাতির দেশ নয়। ভারত কার্যত বহু জাতির দেশ। ভারতকে আমাদের সেভাবেই বিচার করতে হবে। তা না হলে ভারত সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে চাইবে বিভ্রানি-কর। অনেক কিছুই ঘটছে ভারতে। হিন্দি ভাষায় যেমন এখন ব্যবহারের চেষ্টা চলছে আরবি-ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার বৃদ্ধির; তেমনি আবার দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ভাষী মানুষেরা চাচ্ছেন তাদের ভাষায় যেসব সংস্কৃত শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেসব শব্দকে বাদ দিতে। সমগ্র দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ভাষী অঞ্চলে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে সংস্কৃত শব্দবিরোধী মনোভাব। বিশেষ করে তামিলভাষী প্রদেশ তামিলনাড়-তে। তামিলনাড়-কে ব্রিটিশ শাসনামলে বলা হতো মাদ্রাজ প্রদেশ। কিন' ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর প্রদেশটির নাম হয়েছে তামিলনাড়-। তামিল ভাষায় ‘নাড়-’ শব্দের অর্থ হলো দেশ। তামিলনাড়- শব্দের বাংলা করলে বলতে হবে তামিলদের দেশ। তামিলনাড়- হলো দ্রাবিড় ভাষাভাষী সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। ভারতে দেখা দিয়েছে আর্য সংস্কৃতির মধ্যে বিশেষ বিরোধ। ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমানে- আর্য সংস্কৃতির প্রসার কখনওই সেভাবে ঘটেনি। এখানে রয়েছে মঙ্গলীয় মানব ধারার প্রাধান্য। ভারত বিভক্ত হয়ে পড়ছে আর্য, দ্রাবিড় ও মঙ্গল (কিরাত) দ্বন্দ্বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র। এখানে হিন্দি শিক্ষার ব্যবস'া করা অন্যায় হয়েছে বলে আমরা মনে করি না। কিন' হিন্দি শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সাথে কোনোভাবেই পোষণ করতে পারছি না ঐকমত্য। তিনি এমন এক সময় তার এই অভিমত ব্যক্ত করলেন যখন দেশে ঘটছে আরো অনেক কিছু। আমরা পাকিস-ান আমলে উর্দু শিখতে চাইনি, কিন' এখন ভারতের সাথে উন্নত সম্পর্ক সৃষ্টির নামে শিখতে চাচ্ছি হিন্দি। আমাদের এই হিন্দি শিখতে চাওয়া ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কতটা চাপের ফল সেটা নিয়েও জাগতে পারছে সন্দেহ। এই হিন্দি শেখার হুজুগ বিশেষভাবে উঠতে পারছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। যেটা জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি করছে বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিস-ারের পরিকল্পনার একটা চেষ্টা হিসেবে।
২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি লন্ডনে প্রবাসী বিখ্যাত বাংলাভাষী সাংবাদিক সিরাজুর রহমান রেডিও তেহরানকে একটি সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন। এতে তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালে তাজউদ্দিন সরকার ভারত সরকারের সাথে ৭ দফা চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তিতে ছিল বাংলাদেশে নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী থাকবে না। থাকবে না স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। ভারত বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেবে। কিন' শেখ মুজিব এই চুক্তি মানেননি। ভারত সরকার এখন অগ্রসর হচ্ছে ১৯৭১ সালের চুক্তি বাস-বায়ন করার লক্ষ্যে। সিরাজুর রহমান সাহেবের বক্তব্য কতটা নির্ভরযোগ্য তা আমরা বলতে পারি না। তবে ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন বিবিসির সাংবাদিক। আর সেই সুবাদেই তিনি তাজউদ্দিন সরকার সম্পর্কে নানা বিষয়ে হলেন বিশেষভাবে জ্ঞাত। তাই তার কথা হেলাফেলা করা চলে না। একই সময়ে আমরা দেখছি, ভারত এখন চাচ্ছে কেবল আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস'াকে দুর্বল করতেই নয়, এ দেশে হিন্দি ভাষার প্রসার বাড়াতেও। বলা হচ্ছে, হিন্দি ও বাংলা নিকট সম্পর্কীয় ভাষা। ব্যাকরণগত দিক থেকে যা আদৌ সত্য নয়। আমাদের তাই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে ভারতের অভিসন্ধি সম্পর্কে বিশেষভাবে সচেতন হওয়ার। ভারত পাকিস-ান প্রতিষ্ঠার দাবিকে মেনে নিয়েছিল কৌশলগত কারণে। সে এখন চাচ্ছে পাকিস-ানের ধ্বংস। সে এটা চাচ্ছে মার্কিন সহযোগিতায়। বাংলাদেশ সম্পর্কেও তার মনোভাব বাংলাদেশের অনুকূল নয়। সমপ্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন ত্রিপুরায়। ত্রিপুরার মানুষ আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে সংবর্ধনা জানিয়েছেন, সেটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মনঃপূত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। পরোক্ষভাবে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে প্রটোকল নিয়ে।
ভারতের খ্যাতনামা সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার আরব উপদ্বীপ থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ও বহুল পঠিত গালফ নিউজ পত্রিকার ২৮ জানুয়ারি ২০১২ সংখ্যায় লিখেছেন- তার কাছে যেসব সংবাদ আছে, তা থেকে সিদ্ধান- করা যায়, বাংলাদেশে সমপ্রতি যে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল তাতে ছিল আসামের উলফা এবং মনিপুর ও নাগাল্যান্ডের স্বাধীনতাকামী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা। তাই একে কেবল বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কুলদীপ নায়ারের বক্তব্য যদি নির্ভরযোগ্য হয়, তবে বলতে হবে, উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক পরিসি'তি সম্পর্কে আমাদের অধিক অবগত হতে হবে। হিন্দি ভাষার মাধ্যমে সারা ভারতের মানুষ কী ভাবছে সেটা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কারণ ভারতে কেবল হিন্দিভাষী মানুষ বাস করে না; ভারত বহুভাষী মানুষের আবাসভূমি।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

রবিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১২

সিমলা চুক্তি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার


২০১১-১২-০৫

ভারত ও পাকিস-ানের মধ্যে সিমলা চুক্তি সম্পাদিত হয় ১৯৭২ সালের ৩ জুলাই। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বর মাসের ১৭ দিনজুড়ে হয় ভারত-পাকিস-ান যুদ্ধ। এতে তদানীন-ন পূর্ব
পাকিস-ানে জয়ী হয় ভারত। হারে পাকিস-ান। ভারতের হাতে বন্দী হয় প্রায় ৯৩ হাজার সৈন্য। সিমলা চুক্তি অনুসারে এই ৯৩ হাজার যুদ্ধ বন্দীদের (POW) পাকিস-ানের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। এদের কাউকেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হয় না। এ ছাড়া সিমলা চুক্তিতে ভারত ও পাকিস-ান উভয়ই রাজি হয় যে, ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে, কোনো যুদ্ধের মাধ্যমে নয়। চুক্তিটির নাম হয় সিমলা চুক্তি। কারণ এটি সম্পাদিত হয় ভারতের হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলা শহরে। সিমলায় ভারত ও পাকিস-ান এই দুই দেশরে প্রতিনিধিরা চুক্তির আগে দিয়ে করেন আলোচনা সভা, যা ইতিহাসেখ্যাত হয়ে আছে সিমলা সম্মেলন হিসেবে। এই সম্মেলনে ভারতীয় পক্ষের নেতৃত্ব দেন ভারতের তদানীন-ন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। আর পাকিস-ানের পক্ষের নেতৃত্ব করেন তদানীন-ন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জুলফিকার আলী ভুট্টো। এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে ডাকাই হয়নি। বাংলাদেশকে ডাকা হয়নি এর একটা কারণ ছিল, জুলফিকার আলী ভুট্টোর আপত্তির কারণে। ভুট্টো আপত্তি তোলেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধ হয়েছে ভারত-পাকিস-ানের মধ্যে। বাংলাদেশ নামে তখন কোনো রাষ্ট্র ছিল না।
পাকিস-ান বাংলাদেশের সাথে কোনো যুদ্ধ করেনি। যুদ্ধ করেছে ভারতের সাথে। ঢাকায় রমনার মাঠে পাকিস-ানের পূর্বাঞ্চলের সেনাপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেন কেবল ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের কোনো সেনানায়কের কাছে পৃথকভাবে আত্মসমর্পণ করেননি। তাই সিমলা সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি থাকতে পারে না। যুদ্ধ বাংলাদেশ-পাকিস-ানের মধ্যে হয়নি। হয়েছে কেবল ভারত-পাকিস-ানের মধ্যে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর কথায় যুক্তি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পরাজিত হয়েছিল জার্মানি। জার্মান সৈন্য পৃথকভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সেনাপতিদের কাছে। অন্য দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, চীন, নেদারল্যান্ডস, আস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কাছে পৃথক পৃথকভাবে। অন্য দিকে ১৯৭১-এ পাক বাহিনী কেবলই তদানীন-ন পূর্ব পাকিস-ানে আত্মসমর্পণ করেছিল এককভাবে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। ভারত সে দিন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীকে আসতে দেয়নি রমনার মাঠে। যে কারণেই হোক, তাকে আটকে রাখা হয়েছিল কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্টে। ভারত কেন এটা করেছিল তার কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন- পাওয়া যায়নি। আর এর ফলে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ খাতাপত্রে পরিচিত হয়ে আছে কেবল ভারত-পাকিস-ান যুদ্ধ হিসেবে। যদিও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া পাকিস-ানের সাথে যুদ্ধে কখনই ভারতের পক্ষে জেতা সম্ভব হতো না।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস-ানের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, তাতে তদানীন-ন পূর্ব পাকিস-ানের মানুষ গ্রহণ করেনি পাকিস-ানের পক্ষ। ভারত কেবল লড়াই করেছে তার পশ্চিম রণাঙ্গনে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যে যুদ্ধ হয়, তা শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বরে। ভারত একপক্ষীয়ভাবে ১৭ ডিসেম্বর ঘোষণা করে পশ্চিম পাকিস-ানের যুদ্ধবিরতি। ভারতের ব্রিগেডিয়ার আর এন মিশ্র যুদ্ধশেষে সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশে যুদ্ধে জেতা সহজ হতো না। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাই আমরা যুদ্ধে বিজয়ী হতে পেরেছি। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের বলেছে কোথায় কিভাবে পাক বাহিনী যুদ্ধে অবস'ান নিয়েছে। তারা দিয়েছেন আমাদের গোপন সংবাদ। এসব সংবাদ যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যকে বিশেষভাবে সাহাষ্য করেছে। বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয় সৈন্যকে করেছে খাদ্য সরবরাহ। নৌকা দিয়ে সাহায্য করেছে নদী পার হতে। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা ভারতের সেনাবাহিনীকে দিয়েছে মনোবল, দিয়েছে গতি। আর তাই ভারতীয় সৈন্য মরেছে কম। অনেক সহজেই যুদ্ধ করতে পেরেছে পাক বাহিনীর সাথে। মিশ্রর এই বিবৃতি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৭১ সালের লড়াইয়ের চেহারা। কিন' পাক বাহিনী যেহেতু আত্মসমর্পণ করেছিল কেবল ভারতীয় সেনাদের হাতে, তাই যুদ্ধটা বিশ্ববাসীর কাছে এ সময় খ্যাত হয় কেবল পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে। আর সিমলা চুক্তি সম্পন্ন হয় কেবল ভারত ও পাকিস-ানের মধ্যে। এতে বাংলাদেশ কোনো অংশ নিতে পারে না। কেন ১৯৭১-এর যুদ্ধে ভারত মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ককে রমনার ময়দানে আসতে দেয়নি সেটা আমরা বলেছি, এখনো আছে রহস্যময় হয়ে। তবে এর একটা কারণ হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৩ ডিসেম্বর তাদের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ এন্টারপ্রাইজকে বাহরাইন থেকে পাঠায় বঙ্গোপসাগরে। অন্য দিকে ভিয়েতনাম থেকে পাঠায় তাদের সপ্তম নৌবহরের একাধিক জাহাজ। এ সময় আমি ছিলাম কলকাতায়। কলকাতায় মানুষকে বলতে শুনেছি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন নাকি বলেছেন তদানীন-ন পূর্ব পাকিস-ানে যুদ্ধ থামাতে। না হলে মার্কিন সৈন্য অবতরণ করবে তদানীন-ন পূর্ব পাকিস-ানে। তারা ধরে নেবে পূর্ব পাকিস্তান হচ্ছে পাকিস-ানের অংশ। পাকিস্তানের সাথে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক চুক্তি। যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষার ব্যাপারে সাহায্য করতে বাধ্য। মার্কিন চাপ ১৯৭১- এর ডিসেম্বরের যুদ্ধকে প্রশমিত করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি পৃথক বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে। তার ছিল ভিন্ন রকম পরিকল্পনা। সে ভেবেছিল বাংলাদেশে অনেক সহজে সে তার প্রভাব বিস-ার করতে পারবে। আর বাংলাদেশ হবে পাকিস-ানের চেয়ে তার অনুগত রাষ্ট্র। শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতি করেছেন মার্কিন সমর্থনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাই ধরেই নিয়েছিল একটা পৃথক বাংলাদেশ হবে তার জন্য বিশেষ সহায়ক রাষ্ট্র; বৈরী রাষ্ট্র নয়। ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে। এর মূলেও ছিল মার্কিন চাপ। ভারত স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্য সরায়নি। মার্কিন চাপেই সে বাধ্য হয় সৈন্য সরিয়ে নিতে। এসব কথা শুনেছি, একাধিক লোকের মুখে, কলকাতা থেকে দেশে ফেরার পর।
আমি চাকরি করতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অনেক অধ্যাপকের কাছে অনেক কথা শুনেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন পাকিস-ানের সমর্থক অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থক অধ্যাপক। আর ছিলেন ভারতের সমর্থক অধ্যাপকও। নানা রকম আলোচনা শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয় মহলে। এ থেকে যে ধারণা আমার মনে গড়ে উঠেছে, তা হলো ১৯৭১-এর যুদ্ধে শেষ পর্যন- থেকেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ খুবই প্রবলভাবে। ১৯৭১-এর যুদ্ধের গতি প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে করা যায় না। অন্য দিকে ১৯৭১-এ হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের মধ্যে বিশেষ মৈত্রী চুক্তি। এই যুদ্ধে তদানীন-ন সোভিয়েত ইউনিয়নেরও ছিল বিশেষ ভূমিকা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে যুদ্ধে সাহায্য করেছিল নেপথ্যে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে কথা দেয় যে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে চট্টগ্রাম বন্দরে সোভিয়েত ইউনিয়ন পেতে পারবে নৌঘাঁটি গড়ার অধিকার; যদি সে সেটা চায়। চট্টগ্রাম বন্দর থাকবে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে। সোভিয়েত নৌবাহিনীর জাহাজ ছিল দক্ষিণ ভারতের বিশাখাপত্তম বন্দরে। সোভিয়েত জাহাজ থেকে টর্পেডো ছুড়ে ডুবিয়ে দেয়া হয় পাকিস-ানের ডুবোজাহাজ গাজীকে। গাজী আসলে পাকিস-ানের জাহাজ ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটা পাকিস-ানকে ধার দিয়েছিল ১৯৬৪ সালে। নৌযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন অংশ নিয়েছিল। রুশ সেনাপতিরা ১৯৭১-এ ভারতকে রণকৌশল গঠনে দিয়েছিল বিশেষ সাহায্য-সহযোগিতা। পাকিস-ানের যুদ্ধ কেবল হয়ে থাকেনি ভারত-পাকিস-ানের মধ্যে যুদ্ধ। ১৯৭১-এর যুদ্ধ পরোক্ষভাবে হয়েছিল পাকিস-ান-সোভিয়েত যুদ্ধ। রণনীতিতে ভারতীয় সৈন্য উন্নত কৌশল প্রদর্শন করতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা বিশেষজ্ঞদের কারণে। অর্থাৎ ১৯৭১-এর পাক- ভারত যুদ্ধ কেবল ভারত-পাকিস-ানের মধ্যকার যুদ্ধ ছিল না। এতে জড়িয়ে পড়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। ইন্দিরা গান্ধী চাননি যুদ্ধ একটা বৃহত্তর
আন-র্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করুক। ভারত তাই যুদ্ধকে সংক্ষিপ্ত করে। আর চায় না পাকিস-ানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে। সে খুশি হয় সাবেক পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করতে পেরেই। আজ যখন আমি ’৭১-এর যুদ্ধকে ফিরে দেখি, তখন এ রকমই মনে হয় আমার কাছে।
সিমলা চুক্তি নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা করেছেন ভারতের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পিলু মোদি (Piloo Mody)। পিলু মোদি একটা বই লেখেন ১৯৭৩ সালে। বইটির নাম Zulfi my Friend|। পিলু মোদি ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাল্যবন্ধু। তিনি তার বইয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্পর্কে অনেক কিছু লিখেছেন। অনেক কিছু লিখেছেন সিমলা সম্মেলন সম্পর্কে। যা থেকে পাওয়া সম্ভব ইতিহাস লেখার বেশ কিছু উপকরণ। পিলু মোদি হিন্দু সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তি নন। তিনি হলেন ভারতীয় পারসি (Parsi) ধর্ম সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তি। ভারতে পারসি সমপ্রদায় জনসংখ্যার দিক খেকে খুবই নগণ্য। কিন' অর্থনীতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে এরা হলেন খুবই প্রতিপত্তিশালী। ভারতের সবচেয়ে বড় শিল্পপতি ছিলেন জমসেদজী টাটা (তাতা)। যিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন টাটা কোম্পানি। ভারতের রাজনীতিতে পারসিরা রেখেছেন বিশেষ প্রভাব। ভারতের বিখ্যাত রাজনৈতিক দাদাভাই নৌরজি ছিলেন পারসি। নৌরজি প্রথম ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। এটা ছিল সে সময় একটা বিরাট ঘটনা। মিনুমাসানি ছিলেন ভারতের একজন বিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক নেতা। তিনি তার লেখার মাধ্যমে ভারতীয় রাজনীতিতে রেখেছেন বিশেষ প্রভাব। ভারতের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হোমি জাহাঙ্গীর ভবা হলেন পারসি সমপ্রদায়ভুক্ত। মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে এর গবেষণা হয়ে আছে খুবই খ্যাত। ১৯৭১-এর যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এস এইচ এফ জে মানিক শ (পরে মার্শাল) ছিলেন পারসিক সমাজভুক্ত। পিলু মোদি ছিলেন ভারতীয় পার্লামেন্টের সদস্য এবং ভারতীয় স্বতন্ত্র দলের একজন খুবই নামকরা নেতা। ১৯৭২ সালে যখন সিমলা সম্মেলন হচ্ছিল তখন তিনি যান সিমলায়। দেখা করেন ভুট্টোর সাথে। তিনি তাকে দেন বহুবিধ পরামর্শ। এ রকম করাটা তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল তার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কারণেই। ইন্দিরা গান্ধী তাকে বিরত রাখতে পারেননি ভুট্টোর সাথে দেখা ও উপদেশ প্রদান করা থেকে। অন্য কোনো ব্যক্তি হলে তাকে চিহ্নিত হতে হতো ভারতীয় আইনানুসারে দেশদ্রোহী হিসেবে। কিন' পিলু মোদিকে তা হতে হয়নি। পিলু মোদি তার বইয়ে বলেছেন- ইন্দিরা গান্ধী সিমলা সম্মেলনে ওঠান যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করার প্রসঙ্গটি। জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, এতে তার আপত্তি নেই। কিন' বিচার হতে হবে জেনেভা কনভেনশন অনুসারে। জেনেভা কনভেনশন অনুসারে যুদ্ধবন্দী হত্যা হলো অন্যতম যুদ্ধাপরাধ। জেনেভা কনভেনশনানুসারে যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করা যায় না। কিন' পূর্ব পাকিস-ানে ইপিআর তাদের হাতে ধরা পড়া পাক বাহিনী সৈন্যকে বন্দী অবস'ায় হত্যা করেছে। জেনেভা কনভেনশনানুসারে হতে হবে তাদের বিচার। পিলু মোদি তার বইয়ে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উঠতে পারত কাদেরিয়া বাহিনী সম্পর্কে। কাদেরিয়া বাহিনীর নেতা কাদের সিদ্দিকী অমানবিকভাবে নির্বিচারে বিহারি হত্যা করেছেন। সেটাও পড়তে পারে যুদ্ধাপরাধেরই মধ্যে। ইন্দিরা গান্ধী তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে আর বেশি দূর অগ্রসর হতে চাননি। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গেলে দেখা দিত সমূহ জটিলতা। যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে দুই পক্ষ থেকেই। এক পক্ষ থেকে নয়।
আন-র্জাতিক নিয়মে করতে হতো যুদ্ধাপরাধের বিচার। আর আন-র্জাতিক নিয়মে বিচার হলে, বিচারে পাকিস-ান পেতে পারত অধিক সুবিধা। এ কথা বলেছেন, পিলু মোদি তার লেখা Zulfi my Friend বইয়ে। পিলু মোদির মতে, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও শেখ মুজিবের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ ছিল যথেষ্ট গভীর। জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন বিশেষভাবেই দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী। জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন সিন্ধি। কিন' তিনি কখনোই তোলেননি সিন্ধি জাতীয়তাবাদের ধ্বনি। কিন' শেখ মুজিব চেয়েছেন পাকিস-ানের মধ্যে থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বনি তুলে পাকিস-ানের প্রধানমন্ত্রী হতে। জনাব ভুট্টো মেনে নিতে পারেননি পাকিস-ানে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে। তিনি মনে করেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ দেবে সাবেক পাকিস-ানকে দ্বিখণ্ডিত করে। পরবর্তী ঘটনা ভুট্টোর ধারণাকে, পিলু মোদির মতে, যথার্থ প্রমাণ করেছে।
সিমলা চুক্তি অনুসারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ আর ওঠা উচিত ছিল না। কিন' এখন নতুন করে উঠছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ। এর একটি কারণ, বিশ্বরাজনীতির ধারা বিশেষভাবেই বদলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক সময় তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছে কমিউনিজম রোধের লক্ষ্য সামনে রেখে। এখন তাকে পেয়ে বসেছে জঙ্গি ইসলাম আতঙ্কে। বর্তমানে বাংলাদেশে যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হচ্ছে তাদের প্রায় সবাই সাধারণভাবে পরিচিত ইসলামপন'ী হিসেবে। ১৯৭১ সালে এরা সবাই ছিলেন অত্যন- তরুণ। এরা কতটা যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন সেটা তর্কের বিষয়। শেখ মুজিব চাননি এদের বিচার করতে। কিন' এখন এদের উঠতে হচ্ছে বিচারের কাঠগড়ায়। মনে হচ্ছে, সারা দেশে অনেক যুদ্ধাপরাধী আছে। আর তারা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান সমস্যা। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। মনমোহন সিং বাংলাদেশে সফরে আসার ঠিক আগে দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশ ভরে উঠেছে মুসলিম মৌলবাদে। মুসলিম মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করে বাংলাদেশের শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ। পরে তিনি তার এই বক্তব্যকে প্রত্যাহার করে নেন। মনে হচ্ছে জামায়াতকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে বিশেষ করে উঠানো হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি। এ ক্ষেত্রে আছে ভারতেরও একটি ভূমিকা। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন লাভের আশায় উদ্যোগ নিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের। অথচ ১৯৭২-এর সিমলা চুক্তি অনুসারে এ রকম বিচার অনুষ্ঠান হওয়া উচিত ছিল না। সিমলা চুক্তির কোনো মূল্য এখন আর নেই।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব মিথ্যা হতে যাচ্ছে

২০১১-১১-২১

কয়েক মাস ধরে শোনা যাচ্ছে, প্রায় এক শ বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত জার্মান ইহুদি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের (১৮৭৯-১৯৫৫) আপেক্ষিক তত্ত্ব নাকি ভুল প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। কারণ আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে কোনো কিছুর গতিবেগ আলোর গতিবেগের চেয়ে অধিক হতে পারে না। কিন' বর্তমানে কিছু বৈজ্ঞানিক দাবি করছেন, নিউট্রিনো (Neutrino) নামক মৌলকণিকার গতিবেগ হতে পারে আলোর চেয়ে সামান্য বেশি। যদি এটা আরো পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব বাতিল হয়ে যাবে। তাকে ধরে রাখা সম্ভব হবে না। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছিল মাইকেলসন মার্লির বিখ্যাত পরীক্ষাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। এক সময় মনে করা হতো, বিশ্ব পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে এমন কিছু দ্বারা; যা বহন করে আলোক, বিদ্যুৎ ও চৌম্বক তরঙ্গ।
এই এমন কিছুকে বিজ্ঞানীরা বলতেন ইথার। কিন' ইথারের ধারণা সত্য হলে আলোর গতিবেগ সব ক্ষেত্রে এক হতে পারে না। বিভিন্ন দিক থেকে আলোর গতিবেগ নির্ণীত হলে তাতে ধরা পড়ত পার্থক্য। কিন' মাইকেলসন মার্লির পরীক্ষা থেকে দেখা যায়, এরকম পার্থক্য ঘটছে না। আলোর গতিবেগ সব দিক থেকে হচ্ছে সমান। আইনস্টাইন তার আপেক্ষিক তত্ত্বে চান এর কারণ ব্যাখ্যা করতে। এটা করতে গিয়ে বাতিল হয়ে যায় ইথারের ধারণা। আপেক্ষিক তত্ত্বে বলা হয়, আলোর গতিবেগ সর্বত্র সমান হতে বাধ্য। এটা দেখানো হয় বিশেষ গাণিতিক সূত্রের দ্বারা। আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে আসে বস'র আপেক্ষিক জড় মানের (Relative Mass) ধারণা। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জে জে টমসন (J J Thomson) পরীক্ষার মাধ্যমে দেখতে পান, মৌলবস'কণিকা ইলেকট্রনের গতিবেগ বাড়ার সাথে সাথে তার জড়মান বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ তার গতিবেগ বাড়াতে হলে প্রয়োজন হয় আরো অধিক পরিমাণ বলের। এই বলের বৃদ্ধির পরিমাণ বিজ্ঞানী নিউটনের দেয়া সূত্র অনুসারে করা যায় না। আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে দেখান, তার আপেক্ষিক তত্ত্বের সাহায্যে এই জড়মান বৃদ্ধির হিসাব সম্ভব। তিনি প্রদান করেন তার বিখ্যাত জড় ও তেজের মধ্যকার সমভরতার (Equivalence of Mass and Energy) ধারণা। এই ধারণা অনুসারে জড়বস'কে ভাবা যায় তেজের একটি ঘনীভূত সুপ্ত রূপ। আইনস্টাইনের এই ধারণা থেকে আসে পরমাণু বোমা তৈরির ভিত্তি। আমাদের দেশে রূপপুরে যে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স'াপিত হতে যাচ্ছে, তাতে ইউরেনিয়াম পরমাণু ভেঙে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপন্ন হবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে প্রাপ্ত সূত্র অনুসরণ করে। পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বকে বিশেষভাবে গ্রহণীয় করে তোলে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, আইনস্টাইনের ব্যক্তিগত অনুরোধে
তদানীন-ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট পরমাণু বোমা নির্মাণের জন্য প্রদান করেন বিপুল অর্থ। আইনস্টাইন ব্যক্তিগতভাবে এক সময় ছিলেন বিশেষভাবে শানি-বাদী ও যুদ্ধের বিরোধী। কিন' তারই ইচ্ছায় উদ্ভব হতে পেরেছে পরমাণু বোমার মতো জনবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের উদ্ভব। আপেক্ষিক তত্ত্ব, তত্ত্ব হিসেবে ভুল প্রমাণিত হলেও তার প্রদত্ত জড় ও তেজের সমভরতার হিসাব টিকে যাবে বলেই মনে হয়। আমরা বলেছি, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে জড়বস'কে মনে করা যায় তেজের (Energy) ঘনীভূত রূপ মাত্র। কিন' এই ধারণাকে অনেকে স্বীকার করতে চাননি। বিষয়টি নিয়ে থেকেছে বিতর্ক। মৌলকণিকাদের (Elementary Particles) দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়- ফার্মিয়ন (Fermion) ও বোসন (Bosons)। ফার্মিয়ন নামটা এসেছে বিখ্যাত ইতালিয়ান বৈজ্ঞানিক এনডিকো ফার্মির নাম থেকে। অন্য দিকে বোসন নামটি এসেছে বাঙালি বৈজ্ঞানিক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর (১৮৯৪-১৯৭৪) নাম থেকে; যিনি এক সময় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক। বোসন কণিকারা অনুসরণ করে বসু- আইনস্টাইন প্রদত্ত সংখ্যাতত্ত্বের সূত্র। ফার্মিয়ন কণিকা অনুসরণ করে ফার্মি প্রদত্ত সংখ্যাতত্ত্ব (Statistics)। এই দুই সংখ্যাতত্ত্বের মধ্যে পার্থক্য আছে। ফার্মিয়নদের সংখ্যা যেভাবে ঠিক থাকে বোসনদের সংখ্যা সব অবস'ায় সেভাবে ঠিক থাকে না। ফার্মিয়নদের মধ্যে পড়ে ইলেকট্রন, প্রোটনের মতো মৌলকণিকা। পক্ষান-রে বোসনের মধ্যে পড়ে আলোর কণিকা (ফোটন) এবং কিছু মেশন নামক কণিকা। অর্থাৎ পদার্থ বিজ্ঞানে আছে নানা জটিলতা। ১৯৬০ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পদার্থবিদ জি পি টমসন (G P Thomso) ব্রিটেনে বিজ্ঞান সমিতির এক সভায় বলেন, জড়বস'কে কেবলই তেজের একটা সুপ্ত অবস'া হিসেবে বিবেচনা করা সঙ্গত নয়। অর্থাৎ ১৯৬০-এর দশকে আইনস্টাইনের ধারণা নিয়ে উঠতে পেরেছিল প্রশ্ন। আমি ব্যক্তিগতভাবে পদার্থ বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট নই। তাই এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট মতামত প্রদান করতে পারি না। কিন' পদার্থ বিজ্ঞানের অনেক ধারণা যুক্ত হয়ে পড়েছে দর্শনের সাথে; যা ভাবায় আমাদের মতো মানুষকেও। মানুষ জন্মায়, বেড়ে ওঠে, বৃদ্ধ হয়; মারা যায়। সময়ের ধারণা মানুষের মধ্যে বিশেষভাবে সৃষ্টি হতে পেরেছে জন্ম-মৃত্যুকে ঘিরেই। আমরা আমাদের জীবনে যেসব ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করি তাদের সাজায় সময়ের ভিত্তিতে। ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ধারণা আমাদের জীবনের ধারণার সাথে, বেঁচে থাকার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে গ্রোথিত। অন্য দিকে বস'দের আমরা সাজাই স'ানে, নির্দিষ্ট দূরত্বে। এভাবেই গড়ে ওঠে আমাদের ব্যবহারিক জীবনের স'ান-কালের ধারণা। আপেক্ষিক তত্ত্বে স'ান-কালকে দেখা হয় একত্রে। স'ান ছাড়া কালের অসি-ত্ব নেই। আবার কাল ছাড়াও স'ানের অসি-ত্ব নেই। আপেক্ষিক তত্ত্বের স'ান-কালের ধারণা আমাদের ব্যবহারিক জীবনের স'ান-কালের ধারণার সাথে খাপ খেতে চায় না। তার জ্যামিতি হলো যথেষ্ট জটিল। ইউক্লিডের জ্যামিতি থেকে যা হলো ভিন্ন। ইউক্লিডের জ্যামিতিতে সরল রেখার অসি-ত্ব আছে। কিন' আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের জ্যামিতির মাপে সরল রেখার অসি-ত্ব নেই। সব রেখাই কোনো না কোনোভাবে বাঁকা। যা বুঝতে হলে গ্রহণ করতে হয় বার্নার্ড রিম্যানের (Bernhard Riemann) জ্যামিতিকে। আমরা শুনেছি, নিউট্রিনোর (Neutrino) গতি আলোর কণার (Photon) গতির চেয়ে বেশি হতে পারে। এ কথা প্রমাণিত হলে নাকি প্রমাণিত হবে সময় নেগেটিভ হতে পারে, এই ধারণ। কিন' সময় কি কখনো নেগেটিভ হতে পারে? সময় নেগেটিভ হলে, সে ক্ষেত্রে বৃদ্ধ হতে থাকবে যুবক; যুবক হতে থাকবে কিশোর; কিশোর হতে থাকবে শিশু; আর শেষে শিশু প্রবিষ্ট হবে মাতৃগর্ভে। কী বিচিত্র সব ধারণা। যা আমাদের সবাইকে বিস্মিত না করে পারে না। আর তাই বিজ্ঞানীসমাজে কেবল নয়, সবার মধ্যেই উঠছে বিশেষ আলোচনা। কিন' জগৎটা কেবলই অঙ্কের হিসাব নয়। অঙ্কের হিসাবের সীমাবদ্ধতা আছে। কেউ বিশ বছরে তিন হাত লম্বা হলে, চল্লিশ বছরে ছয় হাত লম্বা হয়ে যায় না। বাস-ব জগৎ অনুসরণ করে তার নিজের নিয়ম, যা অঙ্কের হিসাবনির্ভর নয়। বিশুদ্ধ পদার্থ বিজ্ঞান খুব বেশি গণিতের হিসাবনির্ভর। আর এই গণিতের হিসাব থেকে এমন অনেক ধারণা আসে, যা আমাদের মনে জাগায় বিরাট বিস্ময়। যেমনটি জাগাচ্ছে আমাদের মনে সমপ্রতি।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট